সোমবার, ২২ জুলাই ২০২৪

|

শ্রাবণ ৬ ১৪৩১

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

কদমরসুল সেতুর অপেক্ষা বাড়ছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই নদী পারাপার

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৪৫, ৫ জুলাই ২০২৪

কদমরসুল সেতুর অপেক্ষা বাড়ছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই নদী পারাপার

কদমরসুল সেতু

বিডি নিউজঃ পঁয়ষট্টি বছর বয়সী অটোরিকশা চালক জাহাঙ্গীর মৃধা থাকেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া এলাকায়। মাসখানেক আগে রাত ২টার দিকে প্রতিবেশী এক নারীর প্রসব বেদনা উঠলে তার ডাক পড়ে।

বন্দর উপজেলায় আধুনিক সুবিধা সম্বলিত হাসপাতাল না থাকায় বাসিন্দাদের ভরসা করতে হয় নারায়ণগঞ্জ শহরের দুই সরকারি হাসপাতালের ওপর। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে পোহাতে হয় নানা ঝক্কি। বন্দর থেকে সদরে পৌঁছাতে পার হতে হয় শীতলক্ষ্যা নদী।

সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় রাতের বেলা কেউ অসুস্থ হলে। কারণ রাত ১২টার পর ঘাটে ট্রলার থাকে না। প্রায় সময় নৌকা জোগাড় করাও মুশকিল হয়ে যায়।

জাহাঙ্গীর মৃধা সেই রাতে তার অটোরিকশায় করে প্রতিবেশী সেই প্রসূতি নারীকে নিয়ে কয়েক কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ঘাটে এসে দেখেন, কোনো ট্রলার বা নৌকা নেই।

তখন কয়েক কিলোমিটার ঘুরে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু দিয়ে নদী পার হয়ে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পৌঁছাতে লাগে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা।

জাহাঙ্গীর বলেন, “সেন্ট্রাল ঘাটের কাছাকাছি একটা সেতু থাকলে দুই মিনিটও লাগত না। এই রকম প্রায় সময়ই রোগীরা ঝামেলায় পড়েন।”

নারায়ণগঞ্জের বুক চিরে বয়ে চলা শীতলক্ষ্যা নদী জেলার গুরুত্বপূর্ণ দুই উপজেলা সদর ও বন্দরকে করেছে আলাদা। দুই উপজেলার হাজার হাজার মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াত সহজ করতে একটি সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের।

সেই দাবি পূরণে ২০১৮ সালে শহরের ৫ নম্বর ঘাট এলাকায় ‘কদমরসুল সেতু’ নির্মাণের উদ্যোগ হাতে নেয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। কিন্তু ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও নানা জটিলতায় আটকে আছে সেই কাজ। এরই মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ।

সিটি করপোরেশন বলছে, সম্প্রতি প্রকল্পের কাজে কিছুটা গতি এসেছে। ঠিকাদার নিয়োগের কাজও শেষ পর্যায়ে। এখন দ্রুততার সঙ্গেই সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা যাবে বলে কর্মকর্তারা আশাবাদী।

নারায়ণগঞ্জ জেলার দুই প্রান্তে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর দুটি সেতু থাকলেও মধ্যবর্তী এলাকায় বসবাস করা মানুষের সেগুলো কাজে লাগছে না।

বন্দরের সেন্ট্রাল খেয়াঘাট থেকে মদনগঞ্জে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর দূরত্ব সড়ক পথে অন্তত তিন কিলোমিটার৷ সেতু পার হয়ে আবার সদরে মূল শহরে আসতে আসতে আরও তিন থেকে চার কিলোমিটার পথ পার হতে হয়৷

অপরদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সংযোগের জন্য তৈরি করা কাঁচপুর সেতুটি সেন্ট্রাল ঘাট থেকে অন্তত ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে।

কিন্তু কদমরসুল সেতু বন্দর ও সদরের দুই শহরের মধ্যে সংযোগ তৈরি করলে তা মাত্র দুই মিনিটের পথ হবে৷

সেতু না হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজন ও পেশাগত তাগিদে দুই উপজেলার মানুষ প্রতিদিন চারটি খেয়াঘাট দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে নৌকা, ট্রলারে নদী পার হচ্ছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নদী পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনাও ঘটে।

দুই দশকের অপেক্ষা

অন্তত দুই দশক আগে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ের মানুষের চলাচল সহজ করতে নবীগঞ্জ এলাকায় একটি সেতু নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

এরপর প্রায় অর্ধযুগ আগে কদমরসুল সেতু নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হলে আশায় বুক বাঁধেন দুই পারের মানুষ। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও সেতুর কাজ শুরু না হওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

শীতলক্ষ্যার পাড়ের ৫৫ বছর বয়সী চায়ের দোকানি মো. কবির বলেন, “সেতু হইব, সেতু হইব- শুনতে শুনতে আমার চুল পাইকা গেছে। সেতু আর দেখি নাই।

“যখনই নির্বাচন আসে, সবাই সেতুর কথা কয়, কই সেতু তো আর দেখি নাই। মদনগঞ্জে একটা সেতু হইছে তাতে আমাগো কী লাভ হইছে। ওই অত ঘুইরা নদী পার হইয়া তো লাভ নাই।”

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাঙ্ক্ষিত সেতু না হওয়ায় দুর্ভোগ কমেনি তাদের। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় বন্দর উপজেলার বাসিন্দাদের।

প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে নদী পেরিয়ে শহরে আসেন। শীতলক্ষ্যার মত ব্যস্ত নৌপথে নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারই তাদের একমাত্র ভরসা।