রোববার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫

|

অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪৩২

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

নারায়ণগঞ্জে এক যুগে ১০৫ শিশু হত্যার শিকার

প্রকাশিত: ১২:১৬, ৩০ নভেম্বর ২০২৫

নারায়ণগঞ্জে এক যুগে ১০৫ শিশু হত্যার শিকার

ফাইল ছবি

নারায়ণগঞ্জে প্রায়ই একাধিক শিশু হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়। ব্যক্তিগত আক্রোশ, যৌন বিকৃতি, পরকীয়া, জমি নিয়ে বিরোধ, প্রতিশোধ, অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবির মতো কারণে ফুলের মতো শিশুদের জীবন অকালে ঝরে যাচ্ছে। গত এক যুগে নারায়ণগঞ্জে ১০৫ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে এ সময়ে মাত্র ৯টি শিশু হত্যার বিচার হয়েছে।

এ ধরনের নিষ্ঠুরতা বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অপরাধীদের বিকৃত মনোভাব এবং সমাজে শিশুদের অসহায় অবস্থার চিত্রই তুলে ধরছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিশু হত্যার নেপথ্যে রয়েছে পরকীয়া, জমি নিয়ে বিরোধ, বিকৃত মনোভাব ও অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি। বর্তমানে শিশু হত্যার প্রক্রিয়া বীভৎস থেকে বীভৎসতর হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ শহিদ মাহমুদ। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের নৃশংস ঘটনার শিকার হচ্ছে মূলত দরিদ্র পরিবারের শিশুরা।

নির্যাতনকারীরা হচ্ছে প্রভাবশালী। ঘটনা ঘটছে, মামলা হচ্ছে কিন্তু বিচার যে শেষ হচ্ছে, তার কোনো নজির দেখা যাচ্ছে না।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণ-অভ্যুত্থানের সময় বাড়ির ছাদে ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনও ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফতুল্লায় চার বছরের শিশু আফরানকে তার বাবা হাবিবুল্লাহ শিপুল খুন করেন। পুলিশ জানায়, ঋণের চাপে হতাশ হয়ে তিনি এ ঘটনা ঘটান। আড়াইহাজারের মারুয়াদী গ্রামে আট বছরের শিশু সাব্বির আহমেদকে হত্যা করেন বাবা ও সত্মা। ২০১৫ সালে পাঁচ বছরের আকিব হোসেন এবং ২০১৮ সালে তিন বছরের জুঁইকে অপহরণ করে মুক্তিপণের জন্য হত্যা করা হয়। ২০১৬ সালে রূপগঞ্জে ১০ বছরের শিশুশ্রমিক সাগর বর্মণকে পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়।

২০১৯ সালে সিদ্ধিরগঞ্জে বলাত্কারের পর সাত বছরের তানজিলকে হত্যা করেন মাদরাসা শিক্ষক। ২০১৭ সালে সোনারগাঁওয়ে ৯ মাসের জান্নাতুলকে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করেন বাবা জহিরুল ইসলাম।

এসব ঘটনার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের আদালতে ৯ শিশু হত্যার বিচার হয়েছে। আরো বেশ কিছু মামলা বিচারাধীন। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে এক ধরনের বিচারহীনতার ধারণা তৈরি হচ্ছে। এতে তারা আরো অপরাধ করতে উৎসাহিত হচ্ছে।

আড়াইহাজারে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার পাঁচ বছরের লিজার বাবা রমজান আলী বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। আমাগো কোনো বিচার নেই।’

নারায়ণগঞ্জ জজকোর্টের আইনজীবী আবুল বাশার রুবেল বলেন, ‘বড়দের দ্বন্দ্ব কিংবা নষ্টামিতে কেন শিশুদের প্রাণ যাবে? নারায়ণগঞ্জ আদালতে বেশ কয়েকটি শিশু হত্যার বিচার হয়েছে। আরো মামলা বিচারাধীন।’

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান সরকারি মুড়াপাড়া কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সানজীদা পারভীন। তিনি বলেন, ‘পরকীয়ার জেরে বলেন আর মুক্তিপণ দাবি বলেন, যারা এসব কারণে শিশুদের হত্যা করে তারা আসলে মানসিকভাবে অশান্তিতে থাকে। তারা মানসিকভাবে সুস্থ নয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘শিশুদের জিম্মি করে বড়দের শিক্ষা দেওয়া হয়। শিশুদের হত্যার ঘটনা ক্রমে বাড়ছে। মামলা ও আইনগুলো নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

রূপগঞ্জ থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘শিশু হত্যার বিষয়টি নিষ্ঠুরতা। এটা যারা করে, তাদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে।’

আড়াইহাজার থানার ওসি নাসিরউদ্দিন খন্দকার বলেন, ‘আমার সময়ে এমন ঘটনা ঘটেনি। তবে শিশুর ঘটনায় আমরা খুবই সর্তক আছি।’

সহকারী পুলিশ সুপার (গ-সার্কেল) মেহেদি ইসলাম বলেন, ‘আগে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো আদালত দেখবেন। তবে নতুন করে যেন শিশু হত্যার ঘটনা না ঘটে, সেদিকে আমরা নজরদারি করছি।’