ফাইল ছবি
শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে একের পর এক গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে সুতা ব্যবসার ওপর। টানবাজারের ঐতিহ্যবাহী সুতা ব্যবসার দেউটিও একে একে নিভতে বসেছে। এক বছরে পাঁচ শতাধিক সুতা কারখানার মালিক ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। আগামী ছয় মাসের মধ্যে আরও অনেক গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাবে। অনেক স্পিনিং মিলস উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। চলছে শ্রমিক ছাঁটাই।
এভাবে শ্রমিক ছাঁটাই চলতে থাকলে সেটি দেশের জন্য খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম সোলাইমান হোসেন। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস সেক্টরের সঙ্গে সুতার ব্যবসা সম্পর্ক রয়েছে। গার্মেন্ট সেক্টর যদি ভালো না থাকে তাহলে আমরা সুতা বিক্রি করব কোথায়? এক্সপোর্ট ভালো না থাকলে গার্মেন্টসের ক্ষতি মানেই আমাদের ক্ষতি।
এম সোলাইমান আরও বলেন, এ খাতের ব্যবসায়ী অনেক কমে গেছে। শ্রমিকরা কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন। প্রতি গদিতে ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক লাগে। সেই হিসাবে ১ হাজার ঘর হলে ১০ হাজার শ্রমিক থাকে। তাদের প্রায় অর্ধেক কর্ম নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। এক বছরে পাঁচ শতাধিক ব্যবসায়ী ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। আমরা আশা করি, নির্বাচিত সরকার এলে পরিস্থিতি ভালো হবে। বিদেশি বায়াররা আসতে সাহস করবে। তারা নিশ্চয়তা পাবে। ব্যবসা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।’
জানা গেছে, ভারতসহ বড় দেশগুলো বন্ডের মাধ্যমে মাল ঢুকিয়ে দিচ্ছে; এতে সুতা ব্যবসায় আরও ক্ষতি হচ্ছে। কোটি কোটি টাকার মালামাল ব্ল্যাকে বিক্রি হচ্ছে। এক সময় সুতার জন্য বিখ্যাত ছিল নারায়ণগঞ্জের টানবাজার। এখান থেকে দেশজুড়ে সরবরাহ হতো বিভিন্ন ধরনের সুতা। কিন্তু সুতার ব্যবসা এখন আর ভালো যাচ্ছে না।
আর যারা কর্মসংস্থানে রয়েছেন তাদেরও তেমন বেতন মিলছে না। আগে ওভারটাইম পেলেও এখন আর সেই অভারটাইম মিলছে না। অনেক স্পিনিং মিলস উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল বাজারও খারাপ। ভারতসহ বড় দেশগুলো বন্ডের মাধ্যমে মাল ঢুকিয়ে দিচ্ছে; এতে সুতা ব্যবসায় আরও ক্ষতি হচ্ছে। কোটি কোটি টাকার মালামাল ব্ল্যাকে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
শহরের টানবাজার খালপাড় এলাকায় সুলতানা আক্তার নামে এক শ্রমিক বলেন, ‘আগে অনেক ওভারটাইম করতাম। এখন ওভারটাইম দূরের কথা কাজই পাই না। তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যেতে হয়। আগে বেতন পাইতাম ৩০ হাজার টাকা, এখন পাই ১২ হাজার টাকা। যে টাকা পাই সেই টাকা দিয়ে সংসার চলে না।’
একইভাবে রাজু নামে এক শ্রমিক বলেন, ‘১৭ থেকে ১৮ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। বর্তমানে পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আমাদের আশপাশ এলাকায় দেড়শ’ সুতার কারখানা ছিল। বর্তমানে ২০টিও নেই। কাজের চাপ অনেক কমে গেছে। কিছুদিন পর কাজ করতে পারব কিনা তা নিয়েও শঙ্কায় আছি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ করে আসছি। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে কোথায় যাবো তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
মেসার্স মুজিব এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার জয়দেব চন্দ্র সাহা বলেন, ‘বর্তমান দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে ব্যবসা অনেক খারাপ। আমাদের কাজও অনেক কমে গেছে।’
বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. সিরাজুল হক হাওলাদার বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে এ ব্যবসা করে আসছি। ব্যস্ততার কারণে আগে দিনরাত গদিতে থাকতাম। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টায় ক্রেতাদের আনাগোনায় সরগরম থাকত আমাদের গদিগুলো। ক্রেতারা এলেও দুপুরের মধ্যেই গদি ফাঁকা হয়ে যায়। এখন গদিতে তেমন আসাই হয় না।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের অনির্বাচিত সরকার। বহির্বিশ্বের বায়াররা রাজনৈতিক সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের সহযোগিতা না থাকায় ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে। আর সুতার ব্যবসা গার্মেন্টসের ওপর নির্ভরশীল। অনেক গার্মেন্টস বন্ধ থাকায় এ ব্যবসায় প্রভাব পড়ছে। আমাদের ধারণা নির্বাচিত সরকার এলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। বলতে গেলে ৭০ শতাংশ ব্যবসা নষ্ট হয়ে গেছে।’
টানবাজারের সুতা ব্যবসায়ী জুয়েল হোসেন ও মজিবুর রহমান বলেন, ‘দুই বছর আগে ব্যবসা ভালো ছিল। বর্তমানে একেবারে নাজুক অবস্থা। এর কারণ বর্তমানে যারা সরকারে আছে উনারা রাজনীতিবিদ না। দেশ পরিচালনা রাজনীতিবিদরাই ভালো বুঝেন। তারাই ভালো বুঝে কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়।’ তিনি বলেন, আমরা মনে করি যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা উচিত। কারণ গত বছরের ৫ আগস্টের রপ্তানি অনেক কমে গেছে। আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব মালামাল যায়Ñ সেখানে আমাদের কোটি কোটি টাকা বাকি পরে গেছে। বন্ডের ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক হতে হবে।’

