শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
দেওভোগের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার সংকট যেন থামছেই না। কয়েকদিন আগের উত্তেজনা, বৈঠক, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও সমঝোতার আশ্বাসের পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বরং শনিবার (১১ জুলাই) সকালে আবারও বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের একটাই দাবি, মাদ্রাসার মুহতামিম (প্রিন্সিপাল) মাওলানা আবু তাহের জিহাদীর পদত্যাগ।
সকাল থেকেই মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন ব্যানার ও স্লোগানে তারা জানান, পূর্বঘোষিত ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হলেও মুহতামিম এখনও দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।
শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের অভিযোগ, শিক্ষক মুফতি হারুন অর রশিদকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ৫ জুলাই যে সংকটের সূচনা হয়েছিল, তা এখনও নিরসন হয়নি। ওই ঘটনায় দিনভর উত্তেজনার পর প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন মুহতামিমের পদত্যাগ ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হলেও তার কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।
উল্টো যারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, তাদের চিহ্নিত করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থী বলেন, "আমরা শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানিয়ে আসছি। আমাদের বলা হয়েছিল কয়েকদিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু সময় শেষ হলেও কিছুই হয়নি। এখন উল্টো আমাদের ভয় দেখানো হচ্ছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।"
শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, মুহতামিম মাওলানা আবু তাহের জিহাদীর অবিলম্বে পদত্যাগ।সম্প্রতি চাকরিচ্যুত ও অব্যাহতি দেওয়া শিক্ষকদের সসম্মানে পুনর্বহাল।মাদ্রাসার প্রশাসনিক সংস্কার এবং একক কর্তৃত্ব ও স্বজনপ্রীতির অবসান।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মাদ্রাসার প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একক কর্তৃত্ব ও অনিয়ম চলছে। এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুললেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে পড়তে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসায় শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছে।
এর আগে সংকট নিরসনে সাবেক জেলা ছাত্রদল সভাপতি জাকির খানের মধ্যস্থতায় তিন দিনের সময় নেওয়া হয়েছিল। সেই আলোচনায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন, ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মাহবুব আলমসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার্থীরা দ্রুত সমাধানের আশা করলেও বাস্তবে কোনো প্রতিফলন না পাওয়ায় তারা আবারও মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে পুরো ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় তীব্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
উল্লেখ্য, গত ৫ জুলাই শিক্ষক অব্যাহতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেওভোগ মাদ্রাসায় দিনভর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে মুহতামিম আবু তাহের জিহাদীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে খবর ছড়ালেও পরবর্তীতে তার পদত্যাগ ও দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মুহতামিমের পদত্যাগ, শিক্ষকদের পুনর্বহাল এবং প্রশাসনিক সংস্কারের দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না। ফলে দেওভোগের এই ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর নারায়ণগঞ্জবাসীর।

