ফাইল ছবি
জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানো নারায়ণগঞ্জের তরুণ মাহবুব আলম এবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দিচ্ছেন। যে তরুণ একসময় বলেছিলেন, আমি তো আর দেখতে পাবো না, যদি কোনোদিন সংসদে গিয়ে একটু শুনতে পারতাম উনারা কী নিয়ে কথা বলছেন-তার সেই ইচ্ছাই যেন এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।
বুধবার (১১ মার্চ) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রায়হান কবির ঢাকা পোস্টকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আন্দোলনে আহত মাহবুব আলম সাহস ও ত্যাগের প্রতীক। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তাকে ও তার মা হালিমা বেগমকে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অধিবেশনের আগের দিন তাদের থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সংসদে আমন্ত্রণ পাওয়ার খবর শোনার পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মাহবুব। তিনি বলেন, খবরটা শোনার পর সত্যি বলতে কিছুক্ষণ আমি কথা বলতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, আমার জীবনের একটা স্বপ্ন যেন পূরণ হতে যাচ্ছে। আমি তো চোখ হারিয়েছি, কিন্তু দেশের জন্য যে লড়াই করেছি—রাষ্ট্র সেটা মনে রেখেছে, এই অনুভূতিটা আমাকে অনেক শক্তি দিয়েছে।
একসময় সংসদের ভেতরের আলোচনা অন্তত শুনতে চাওয়ার কথা বলেছিলেন মাহবুব। এখন সেই ইচ্ছা পূরণের মুহূর্ত সামনে দাঁড়িয়ে। তিনি বলেন, আমি তখন বলেছিলাম, আমি তো আর দেখতে পাবো না, যদি কোনোদিন সংসদে গিয়ে একটু শুনতে পারতাম উনারা কী নিয়ে কথা বলছেন! এখন মনে হচ্ছে আল্লাহ আমার সেই ছোট্ট ইচ্ছাটাও কবুল করেছেন। সংসদের ভেতরের আলোচনা নিজের কানে শুনতে পারাটা আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার।
সংসদ ভবনে যাওয়ার আগে তার মনে কাজ করছে এক ধরনের আনন্দ ও দায়িত্ববোধ। মাহবুব বলেন, মনে একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে দায়িত্ববোধ। আমি সেখানে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে যাচ্ছি না—আমি যাচ্ছি একজন আহত আন্দোলনকারী হিসেবে। তাই মনে হচ্ছে আমার উপস্থিতিটা যেন দেশের জন্য একটা বার্তা হয়ে থাকে।
দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর তার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে বলে জানান তিনি। চোখ হারানোর পর জীবনটা পুরো বদলে গেছে। আগে যেসব কাজ খুব সহজ ছিল, এখন সেগুলো করতে অন্যের সাহায্য লাগে। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি—দেশের জন্য ভালো কিছু করার ইচ্ছা।
মাহবুব স্মরণ করেন আন্দোলনের সেই দিনটির কথা, যেদিন পুলিশের গুলিতে তিনি চোখের আলো হারান। তিনি বলেন, সেদিন আমরা সবাই রাস্তায় ছিলাম দেশের জন্য, মানুষের অধিকারের জন্য। হঠাৎ করে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়। আমি গুরুতর আহত হই এবং পরে জানতে পারি আমার চোখের আলো আর ফিরে আসবে না। সেই মুহূর্তটা খুব কষ্টের ছিল, কিন্তু এখন মনে করি—দেশের জন্য যদি কিছু দিতে হয়, এটা হয়তো আমার ভাগ্যে ছিল।
মাহবুব বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বিশ্বাস থেকেই তিনি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। আমি সবসময় মনে করেছি, অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকা ঠিক না। দেশের জন্য, মানুষের অধিকারের জন্য কিছু করা দরকার, এই বিশ্বাস থেকেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম।
নিজের আমন্ত্রণকে ব্যক্তিগত সম্মান হিসেবে দেখছেন না মাহবুব। তার মতে, এটি সব আহত আন্দোলনকারীর সম্মান। এটা শুধু আমার ব্যক্তিগত সম্মান না। এটা আসলে সব আহত আন্দোলনকারীর সম্মান। রাষ্ট্র যদি তাদের কথা মনে রাখে, সেটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে মাহবুবের বার্তা, মানুষের কথা যেন তারা মনে রাখেন।তিনি বলেন, “আমি শুধু চাই তারা যেন মানুষের কথা মনে রাখেন। যারা দেশের জন্য কষ্ট দিয়েছে বা ত্যাগ স্বীকার করেছে—তাদের কথা যেন সংসদের ভেতরেও উঠে আসে।”
আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। আমি চাই যারা আহত হয়েছেন, তাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। তারা যেন সমাজে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারেন।
সব শেষে মাহবুব বলেন, যদি কখনো চোখের আলো ফিরে পেতাম, প্রথমে আমি আমার মায়ের মুখ দেখতে চাইতাম। আর দেখতে চাইতাম আমার দেশের পতাকা—যার জন্য এত কিছু হারিয়েও আমি গর্ব অনুভব করি।

