বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

|

ফাল্গুন ২৭ ১৪৩২

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

সোনারগাঁয় জামদানি তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ১৭:০১, ১২ মার্চ ২০২৬

সোনারগাঁয় জামদানি তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা

ফাইল ছবি

ঈদকে সামনে রেখে সোনারগাঁয়ে বিভিন্ন এলাকার জামদানির কারিগর ও শিল্পীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এখন শাড়ি তৈরির কাজ চলছে সোনারগাঁয়ে জামদানি শিল্পীদের ঘরে ঘরে। কেউ কাপড়ে সুতা তোলা, সুতা রং করা আবার কেউ শাড়ি বুনন ও নকশার কাজে সময় কাটাচ্ছেন। ঈদ ছাড়াও জামদানির কদর অন্যান্য কাপড়ের তুলনায় বেশি। বাজারে এ শাড়ি ঢাকাই জামদানি নামে পরিচিতি লাভ করছে।

জানা যায়, সোনারগাঁ উপজেলার প্রায় চারটি ইউনিয়নের প্রায় চার সহস্রাধিক জামদানি তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে মালিপাড়া, সাদিপুর, ব্রাহ্মণবাওগাঁ, খেজুরতলা, কাজিপাড়া, চৌরাপাড়া, মুছারচর, শেকেরহাট, বাসাবো, তিলাব, বস্তল, কলতাপাড়া, কাহেনা, গনকবাড়ি, ওটমা, রাউৎগাঁও, নয়াপুর, উত্তর কাজিপাড়া, চেঙ্গাইন, খালপাড় চেঙ্গাইন, ভারগাঁও, কান্ধাপাড়া, ফিরিপাড়া, গণকবাড়ি, বাইশটেকি, আদমপুর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কারুপল্লী এলাকা উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে ঈদকে সামনে রেখে এসব গ্রামের তাঁতি পরিবাররা জামদানি তৈরিতে ব্যস্ত। একটু ফিরে তাকানোর যেন ফুরসত নেই তাদের। এখানকার জামদানি তাঁতিদের অধিকাংশ শিশু থেকে মধ্য বয়স্ক। 

তবে কম বয়সী তাঁতিরাই জামদানি শিল্পের সঙ্গে বেশি জড়িত। জামদানি শিল্পীদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি  নারী। এ নারীদের হাতের নিখুঁত শৈল্পিকতায় তৈরি হয় জামদানি।

বাংলাদেশ বিশ্বে জামদানি শিল্পের একমাত্র দেশ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি। তবে জামদানি শিল্পের সোনালি দিন এখন আর নেই। সম্ভাবনা যতটুকু আছে তাও যেন হয়ে আসছে সংকুচিত। তবুও দিনদিন এ শিল্পে ধস নামতে শুরু করেছে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় জামদানি উৎপাদনকারী শিল্পীরা হতাশ। জামদানি শিল্পীদের লাভের গুড় এখন খাচ্ছে পিঁপড়ায়। অধিকাংশ তাঁতিই মহাজনদের কাছে দেনার দায়ে বাঁধা। 

মহাজনদের দাদন গুনছে, পাচ্ছেন শুধু মজুরি। সরাসরি তারা শাড়ি বাজারে নামাতে পারছেন না। তাঁতিরা মহাজনদের কাছ থেকে সুতা নিয়ে যান, তাদের দেওয়া নকশা অনুযায়ী শাড়ি তৈরি করে আনেন। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পরও মজুরি কম পান। ফলে শিল্পীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন জামদানি তৈরিতে।

সূত্র জানায়, জামদানিই হচ্ছে বাংলার হারিয়ে যাওয়া মসলিনের বিকল্প প্রতিরূপ। অতীতের মসলিনের মতোই, আজকের জামদানি শাড়ির শিল্প সৌন্দর্যের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। কেবল দেশের বাজারেই নয়, বিশ্ব বাজারেও জামদানির ব্যাপক চাহিদা গড়ে উঠেছে।

জামদানি কারখানার মালিকরা জানান, আগে জামদানি শিল্পীরা শুধু শাড়ি তৈরিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। তবে বর্তমানে জামদানি শিল্পে এসেছে নতুনত্ব। বর্তমানে শাড়ি তৈরির পাশাপাশি থ্রি পিস, ওড়না, পাঞ্জাবি, পর্দার কাপড়ও তৈরি হচ্ছে। ঈদকে সামনে রেখে জামদানির চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী এবার আরও উন্নত এবং নিত্যনতুন ডিজাইনের শাড়ি তৈরি করছেন এখানকার কারিগররা।

জামপুর ইউনিয়নের মালিপাড়া এলাকার জামদানি কারখানার মালিক শুক্কুর আলী জানান, নানা প্রতিকূলতার মাঝেও তাঁতিরা জামদানি তৈরি বন্ধ করেননি। তারা বিভিন্ন ডিজাইনের জামদানির ইঞ্চি পাইড়ে, করলা পাইড়, চালতা পাইড়, ইন্দুরা পাইড়, কচু পাইড়, বেলপাতা, কলকা, দুবলাডং এ ডিজাইনের জামদানি তৈরি করছেন। এসব ডিজাইন বিভিন্ন দামে বিক্রি করে থাকেন। তারা জানান, এখানে ১ হাজার ৮০০ টাকার নিচে কোনো জামদানি শাড়ি তৈরি হয় না। সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকা দামের শাড়িও এখানে তৈরি হয়। তবে এখন এ দামে অর্ডার পাওয়া যায় না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে জামদানি শিল্প দেশের রপ্তানি খাতে বিশেষ অবদান রাখতে পারত।

জামদানি কারিগর সুইটি ও আসাদুল ইসলাম জানান, একটি শাড়ি তৈরিতে এক সপ্তাহ থেকে দু-তিন মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। সময় আর কাজের ওপর দাম নির্ভর করে। এ বস্ত্রের জমিন একাধিক রঙের হয়ে থাকে। জামদানি তাঁতিদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। তাদের রয়েছে বংশানুক্রমিক হাতে-কলমে অর্জিত জ্ঞান। এ শাড়ি যে কেউ তৈরি করতে পারেন না। ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দুয়েকটি দেশ বহুবার চেষ্টার পরও এ শিল্প রপ্ত করতে পারেনি। দিনদিন জামদানি শিল্পীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শাড়িগুলো তৈরি করেন তাদের নিজের শরীরে কখনো জড়াতে পারেন না। 

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কারুপল্লীতে জামদানি কারিগর আবু তাহের জানান, ‘এখন আর জামদানি কারিগররা ভালো নেই। সমস্যা জামদানি কারিগরগো। আমাগো যেই যেই সমস্যা আছে, সেই সমস্যাগুলাইন দূর কইরা সরকার সহযোগিতা করলে জামদানি শিল্প বাঁইচ্যা থাকবো।’

জামদানির তাঁত মালিক ওয়াহিদুর রহমান বলেন, পুঁজির অভাবে চাহিদা অনুযায়ী শাড়ি তৈরি করতে পারছি না। তবে পাইকারি ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিগতভাবে শৌখিন ক্রেতাদের অর্ডার পাওয়ায় কারণে ব্যবসাকে রাখতে পারছি। এ শিল্পের প্রসারের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ প্রয়োজন।

সোনারগাঁ জামদানি তাঁতি সমিতির সভাপতি মো. সালাউদ্দিন বলেন, বর্তমানে জামদানি শিল্পীদের খারাপ সময় যাচ্ছে। ভারতে জামদানি শাড়ি রপ্তানি করতাম। রাজনৈতিক কারণে বর্তমানে সম্ভব হচ্ছে না। সহজ-সরল নারী, অসচ্ছল ও নিরীহ প্রকৃত জামদানি তাঁতিদের আর্থিক দুর্বলতার সুযোগকে ষোলো আনাই কাজে লাগাচ্ছেন এক শ্রেণির দাদন ব্যবসায়ী মহাজনরা। এ শিল্পকে সরকার ইইএফ ফান্ডের আওতায় আনতে পারলে দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য থাকবে না। সরকার জামদানি শিল্পে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দিলে এ শিল্পটিকে বাঁচানো সম্ভব।

সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, জামদানি সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্য। মসলিনের পরেই তার অবস্থান। ঐতিহ্যবাহী জামদানি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে।