ফাইল ছবি
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের বালিয়াপাড়া মাদক কারবারের ট্রানজিট হিসেবে কুখ্যাত। অন্তত আটটি স্পটে কমপক্ষে ৩০ জন মাদক কারবারি নির্বিঘ্নে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। গত বছর এক কারবারিকে পিটিয়ে হত্যা করে বিক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। গতকাল শুক্রবার বালিয়াপাড়ায় মাদকবিরোধী সমাবেশ করে স্থানীয় বিএনপি। এর আগে নেতাকর্মীরা কয়েকজন মাদক কারবারির বাড়িতে গিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে আসেন।
‘জীবনকে ভালোবাসুন, মাদককে না বলুন’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে আড়াইহাজারে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা মাদকবিরোধী সমাবেশ করেন। গতকাল বিকেলে ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের বালিয়াপাড়া বাজারে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে বালিয়াপাড়া এলাকার পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি সোনা আক্তারসহ কয়েকজনের বাড়িতে যান বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিএনপি সূত্রে জানা যায়, এ সময় মাদক কারবারিদের বাড়িতে পাওয়া যায়নি। নেতারা তাদের প্রতিবেশীদের ডেকে মাদক কারবারিদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে বলেন। এ কারবার ছেড়ে ভালো হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তাদের ডাকে সাড়া না দিলে প্রশাসনে কাছে হস্তান্তরসহ সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
পরে মাদকবিরোধী সমাবেশে ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মনির হোসেন বলেন, বালিয়াপাড়া এলাকাটি আড়াইহাজার, সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী। ফলে মাদক কারবারিরা বিভিন্ন প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ এ কারবার চালিয়ে আসছিল। স্থানীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ নির্বাচনের আগে এলাকাটি সফর করে মাদক ও চাঁদাবাজমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বালিয়াপাড়ায় কোনো মাদক কারবারি ও চাঁদাবাজের ঠাঁই হবে না। মাদক কারবার ছেড়ে যদি কেউ ভালো কাজ করে খেতে চায়, তার জন্য এমপির নিজস্ব তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তাও দেবেন। এরপরও যদি কেউ মাদক কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে বা থাকার চেষ্টা করে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, দলের বেশ কিছু নেতাকর্মী অনেক মাদক কারবারিকে সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা করে থাকেন। তাদের অবশ্যই এই সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। মাদক কারবারিরা যাতে দলের নাম ভাঙিয়ে এ কারবার করতে না পারে– এ জন্য দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে।
সমাবেশে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আলম মোল্লা, সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক মোল্লা প্রমুখ।
মাদকের হটস্পট বালিয়াপাড়া
আড়াইহাজার উপজেলার মাদক কারবারিদের নিরাপদ জোন হিসেবে কুখ্যাত বালিয়াপাড়া এলাকা। আড়াইহাজার, সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী হওয়ায় মাদক কারবারিরা এলাকাটি মাদকের ট্রানজিট হিসেবে বেছে নেয়। বালিয়াপাড়া থেকে শুরু করে রূপগঞ্জ হোরগাঁও-দড়িকান্দি ও সোনারগাঁয়ের পাকুন্ডা মাঝেরচর তালতলা, নয়াপুরসহ নরসিংদী-মদনগঞ্জ আঞ্চলিক মহাড়কের এলাকার মাদকসম্রাজ্ঞী হিসেবে পরিচিত সোনা আক্তার। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ের মাদক কারবারিদের তালিকায় জেলার মধ্যে বালিয়াপাড়ার সোনা আক্তারে নাম ছিল ১৬ নম্বরে। তার ছেলে সোহেল মিয়ার নাম ছিল ১০ নম্বরে। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সোহেলকে পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর কিছুদিন মাদক কারবার কমে গেলেও বর্তমানে তা পুরোনো রূপে ফিরেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, বালিয়াপাড়ায় আটটি স্পটে গাঁজা, ইয়াবা, বাংলা মদ, ফেন্সিডিল, হেরোইন কেনাবেচা হয়ে থাকে। স্পটগুলো হচ্ছে– আমির হোসেন সামার বাড়ি, বাংলা কামালের বাড়ি, মাফির চায়ের দোকান, মোক্তার ও আলীর মিয়ার বাড়ি, বালিড়াপাড়া হাইস্কুল-সংলগ্ন ডেবিটের ভাড়াবাড়ি, পাকুন্দার রিপনের দোকান, দুলাল ও মাইনুলের বাড়ি, ওয়াসার লাইন, ভাটি বালিয়াপাড়া গুদারাঘাট ও বালিয়াপাড়া বটতলা-সংলগ্ন হাফেজ সাহেবের মার্কেটের পিয়ালের দোকান। এসব স্পটে ৩০ জন মাদক কারবারি স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় মাদকের কারবার পরিচালনা করে থাকে। পুলিশের একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাদক কারবারির মধ্যে আজিজুল ইসলাম, মোস্তফা মিয়া ডেবিট, কামাল হোসেন ওরফে বাংলা কামাল, আমির হোসেন সামা, মোক্তার হোসেন, আলী হোসেন, দুলাল, রিপন, রাসেল, হানিফ, মাফি, শাহিনুর ইসলাম, ইমন, পিয়াল হোসেন অন্তর, কান্তি বাবু, মাইনুল ইসলাম, সিফাত, মিলন, শুক্কুর আলী, ফয়সাল, সজীব, রুবেল, সাব্বির হোসেন, শাকিল অন্যতম।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদক কারবার
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা মাদক কারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাদক কারবারিরা ভোল্ট পাল্টে স্থানীয় বিএনপির শেল্টার নিচ্ছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, ছাত্রদলের স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতা মাদক কারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। অনেকে ওই নেতার ভয়ে মাদক কারবারিদের নাম নিতেও ভয় পায়।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কাজী আব্দুস সেলিম বলেন, আড়াইহাজারে মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা না থাকা ও রাজনৈতিক প্রভাব মাদক অবাধ বাণিজ্যের অন্যতম কারণ। যার যার অবস্থান থেকে মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা এখন সময়ে দাবি।
আড়াইহাজার থানার ওসি মো. আলাউদ্দিন জানান, আড়াইহাজার উপজেলা ডাকাতি ও মাদকমুক্ত করতে স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ এ ব্যাপারে তৎপর রয়েছে। বালিয়াপাড়ার মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। শিগগিরই এর প্রতিফলন স্থানীয়রা দেখতে পারবেন।

