ফাইল ছবি
নির্বাচনী বিধিনিষেধ শেষ হওয়ার পর প্রচারণার প্রথম দিনেই নারায়ণগঞ্জজুড়ে দেখা গেছে উৎসবের আমেজ। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও বাজার এলাকায় প্রার্থীদের গণসংযোগ, মিছিল ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো জেলা। ভিন্ন ভিন্ন প্রতীক, রঙিন ব্যানার ও কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিতে নির্বাচনী পরিবেশ নতুন রূপ নেয়।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকাল থেকেই সদর, ফতুল্লা, বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট প্রার্থনা শুরু করেন।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে দশ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা আব্দুল্লাহ আল আমিন তার প্রচারণা শুরু করেন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহীদের উদ্দেশ্যে তৈরি দেশের প্রথম জুলাই শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ থেকে। প্রচারণার শুরুতেই ভোটাধিকার রক্ষার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে ও আড়ালে নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বলা হচ্ছে ভোট টাকায় বা সন্ত্রাসে হবে। তিনি এসব বক্তব্যকে জনগণের ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কেউ যদি ভোটাধিকার হরণ বা বাধাগ্রস্ত করতে চায়, তাহলে যেভাবে ফ্যাসিস্ট শক্তিকে জনগণ দেশ থেকে বিদায় করেছে, সেভাবেই নব্য ফ্যাসিস্টদেরও দমন করবে। এর আগে তিনি জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু করেন। তিনি এই যাত্রাকে নারায়ণগঞ্জের পরিবর্তনের যাত্রা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, দশ দলীয় জোটের প্রতিটি প্রার্থীকে বিজয়ী করাই তাদের লক্ষ্য।
একই আসনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী শাহ আলমও প্রচারণার প্রথম দিনেই মাঠে নামেন। দুপুরে ফতুল্লা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে গণসংযোগকালে তিনি বলেন, একটি আসনে একাধিক প্রার্থী থাকাটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কার মাধ্যমে এলাকার উন্নয়ন হবে। তিনি বলেন, তিনি কোনো ভয় পান না এবং বিশ্বাস করেন জনগণ হরিণ মার্কায় ভোট দিয়ে তাকে নির্বাচিত করবে।
শাহ আলম নিজেকে জনগণের প্রার্থী উল্লেখ করে বলেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তিনি সবার প্রতিনিধি হতে চান। প্রচারণাকালে স্থানীয় বিএনপি ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এসময় প্রার্থীসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনি তার প্রচারণা চালিয়ে যান এবং নিজ মার্কা ও বিভিন্ন স্লোগানে এলাকায় ভিন্ন উৎসব আমেজ তৈরি হয়।
ফতুল্লা ইউনিয়ন ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির উদ্যোগে রাতে শারজাহান রি-রোলিং মিলস সংলগ্ন বাজার এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় একটি নির্বাচনী উঠান বৈঠক। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ফতুল্লা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হাজী আক্তার হোসেন এবং সঞ্চালনা করেন ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক সাগর সিদ্দিকী।
উঠান বৈঠকে রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী বলেন, এক সময় দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে মুফতি মনির হোসেন কাশেমীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল এবং এবারও তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে মনোনীত। আইনি জটিলতার কারণে খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, খেজুর গাছে ভোট দেওয়া মানেই ধানের শীষে ভোট দেওয়া।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম প্রচারণার শুরুতেই জনদুর্ভোগ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেন। সকালে নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের শহিদনগর এলাকা থেকে গণসংযোগ শুরু করে তিনি বলেন, শহর ও বন্দর এলাকার রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা, যানজট ও দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত। এসব সমস্যা সমাধানে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে কাজ করবেন।
আবুল কালাম বলেন, তিনি নিজেও ওই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় সমস্যাগুলো তার কাছে নতুন নয়। জনগণের সঙ্গে দীর্ঘদিন দুঃখ-কষ্ট ভাগাভাগি করেছেন বলেই এসব বিষয় তার উপলব্ধির ভেতরে রয়েছে। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে বিরুদ্ধমত দমনের ফলে মানুষের মধ্যে যে মুক্তির আবেগ তৈরি হয়েছে, সেটাই প্রচারণায় জনস্রোতের মূল কারণ। ভোট প্রার্থনা করে তিনি বলেন, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আগামী নির্বাচনে সবার সহযোগিতা চান। বিকেলে তিনি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আবারও গণসংযোগ করেন। যা তার নির্বাচনী এলাকায় ভিন্ন উৎসব আমেজ তৈরি হয়।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মুফতি ইসমাঈল সিরাজীও প্রচারণার প্রথম দিনেই উৎসবমুখর পরিবেশে গণসংযোগ করেন। নির্বাচনী প্রথম দিনেই সকাল থেকে তিনি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মানুষের দ্বারে দ্বারে যান। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া তাকে আশাবাদী করছে এবং বিজয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত জনগণের সঙ্গেই মাঠে থাকবেন।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দশ দলীয় জোটের খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে প্রচারণা শুরু করেন। সকালে তিনি বলেন, দেশের মানুষ পুরোনো রাজনীতি আর চায় না। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা হচ্ছে, তবে জনগণের শক্তির কাছে এসব ষড়যন্ত্র টিকবে না। তিনি বলেন, কেন্দ্র দখলের চিন্তা পরিহার করতে হবে এবং ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।
সিরাজুল মামুন নারায়ণগঞ্জের বড় সমস্যা হিসেবে মাদককে চিহ্নিত করে বলেন, তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে স্বৈরাচারের পথ তৈরি হয়। আগামী নির্বাচনে সংস্কারের পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

