বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

|

ভাদ্র ১০ ১৪৩৩

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

সাখাওয়াতের দুর্বলতায় বেপরোয়া হকাররা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ১১:০৭, ২৬ আগস্ট ২০২৬

সাখাওয়াতের দুর্বলতায় বেপরোয়া হকাররা

ফাইল ছবি

নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদে একের পর এক অভিযান চালিয়েও স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক)। প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার সময় ৬০ দিনের মধ্যে হকার সমস্যা সমাধানের ঘোষণা দেওয়া হলেও ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যকর ও টেকসই সমাধান না হওয়ায় হকারদের দৌরাত্ম্য আবারও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর মারমুখী আচরণ করতে দেখা যাচ্ছে হকারদের। বেশ কয়েকবার উচ্ছেদ কর্মীদের ওপর হামলাও চালিয়েছে তারা। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতা সাখাওয়াত প্রশাসক হয়েও নিজের কর্মীদের হামলা থেকে রক্ষা করতে পারছেন না।

নগরবাসীর অভিযোগ, হকার উচ্ছেদে সিটি করপোরেশনের অভিযান শুরু হলে কয়েকদিন ফুটপাত ফাঁকা থাকছে। এরপর আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু সড়ক ও আশপাশের ফুটপাত। ফলে একদিকে যেমন পথচারীদের চলাচলে ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে যানজটও তৈরি হচ্ছে।

গত ১৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে হকার উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করেন। ওই সময় সড়ক ও ফুটপাত অনেকটাই হকারমুক্ত করা সম্ভব হলেও সেই পরিস্থিতি বেশিদিন ধরে রাখা যায়নি। হকারদের আন্দোলন ও নানা প্রতিবাদের মুখে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

এরপর গত ৪ মে সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ টিমের ওপর হকারদের হামলার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় হকারদের নেতৃত্বে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর জাতীয়তাবাদী হকার ইউনিয়নের সভাপতি কেএম মিজানুর রহমান রনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ঘটনার পর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সদর থানায় মামলা করা হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ৮ জুন শহরে সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদকারী দলের সঙ্গে হকারদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এতে হকার উচ্ছেদ নিয়ে সিটি করপোরেশন ও হকারদের মধ্যে বিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।

পুনর্বাসনের উদ্যোগ, শুরু নিবন্ধন

দীর্ঘদিনের হকার সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানের লক্ষ্যে এবার হকারদের নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে নাসিক। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু সড়কে ব্যবসা করে আসা হকারদের তালিকাভুক্ত করে চাষাঢ়া থেকে ২ নম্বর রেলগেট পর্যন্ত রেললাইনের পাশে নির্ধারিত জায়গায় পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

হকারদের বসানোর জন্য ওই এলাকায় ইতোমধ্যে জায়গা প্রস্তুতের কাজও করা হয়েছে। ইট-বালু ফেলে জায়গাটি সমতল ও ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। এখন সেখানে হকার বসানোর আগে তাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করেছে সিটি করপোরেশন।

তবে নিবন্ধনের তালিকা নিয়েও হকারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, প্রকৃত হকারদের বাদ দিয়ে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং অনেক বহিরাগতকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার ফুটপাত দখল

সর্বশেষ সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিবি রোড এলাকায় হকার উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়। তবে সন্ধ্যার পরই আবার ফুটপাত দখল করে হকার বসার অভিযোগ ওঠে।

এ অভিযোগের পর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নির্দেশে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জাকির সুপার মার্কেটের সামনে ফের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

উচ্ছেদ টিমের প্রধান সম্রাট হাসান সুজনের দাবি, অভিযানকালে হকাররা সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে উচ্ছেদ টিম ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

‘চার মাস ধরে হকারদের ওপর স্টিমরোলার’

নারায়ণগঞ্জ মহানগর জাতীয়তাবাদী হকার দলের সভাপতি মিজানুর রহমান রনি বলেন, গত চার মাস ধরে সিটি করপোরেশন হকার উচ্ছেদ অভিযান চালালেও পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা করা হয়নি।

তিনি অভিযোগ করেন, ‘হকারদের বাড়িতে খাবার নেই, তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। পুনর্বাসনের নামে যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই বহিরাগত।’

রনির দাবি, প্রকৃত হকারদের ডেকে তাদের মতামতের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করা উচিত ছিল। রেলওয়ের অনুমতি নিয়ে নির্ধারিত স্থানে হকারদের বসানোর ব্যবস্থা করা হলে তারা সেখানে যেতে রাজি। তবে সঠিক প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদ করা হলে হকাররা নতুন জায়গায় যাবেন না বলেও জানান তিনি।

প্রশ্ন উঠছে নেতৃত্ব নিয়ে

নগরবাসীর একাংশের মতে, হকার উচ্ছেদে শুধু অভিযান পরিচালনা করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। উচ্ছেদ, পুনর্বাসন, নিবন্ধন এবং নির্ধারিত স্থানে ব্যবসার সুযোগ—এই চারটি বিষয় সমন্বয় করে একটি স্থায়ী পরিকল্পনা প্রয়োজন।

অন্যদিকে হকারদের দাবি, পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা না দিয়ে বারবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। ফলে অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই তারা আবার ফুটপাত ও সড়কের পাশে বসে পড়ছেন।

প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬০ দিনের মধ্যে হকার সমস্যার সমাধানের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় এখন নাসিকের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসীর কেউ কেউ। তবে হকার সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের সাম্প্রতিক নিবন্ধন ও পুনর্বাসন উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।