ফাইল ছবি
১৮ জুলাই, বৃহস্পতিবার
আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ টিয়ারগ্যাস ও গুলি ছুড়লে পুলিশের গাড়ি ভাঙে আন্দোলনকারীরা। এ ঘটনার পর উত্তপ্ত হতে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ। এর আগের কয়েকদিনের মতো এদিনও বেলা ১১টায় শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়া ও দুই নম্বর রেলগেইটে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। দুপুর ১টার দিকে আন্দোলনকারীদের দমাতে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও গুলি ছুড়লে চাষাঢ়ায় পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় পুলিশ আন্দোলনরতদের উপর জলকামান টিয়ারশেল ও গুলি নিক্ষেপ করে।
অন্যদিকে, আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। বিকাল পর্যন্ত চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। ছাত্র জনতার উপর বিকেলে সশস্ত্র হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
এর জেরে সন্ধ্যার পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক আকারে প্রতিক্রিয়া দেখায় নারায়ণগঞ্জের ছাত্র-জনতা। প্রতিক্রিয়ায় টিয়ারগ্যাস ও গুলি করে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করলেও আন্দোলন দমেনি। ব্যাপক গুলি করা হয় সাইনবোর্ড এলাকায়। এক পর্যায়ে গুলি শেষ হয়ে গেলে পুলিশ পিছু হটে। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয় জেলা পিবিআই কার্যালয়, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, শহরের দুই নম্বর রেলগেটের পুলিশ বক্স, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের অফিস।
১৯ জুলাই, শুক্রবার
শুক্রবার সকাল থেকেই জেলাজুড়ে বিরাজ করছিল থমথমে অবস্থা। জেলার সাইনবোর্ড, চিটাগাংরোড, জালকুড়ি, ভূঁইগড়, চাষাঢ়াসহ বেশকিছু স্পটে দলবেঁধে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা। কোথাও সড়ক বিভাজকের কিছু অংশ তুলে, কোথাও গাছ ফেলে সড়কে অবরোধ তৈরি করা হয়। এদিন লিংক রোড, চাষাঢ়া, জালকুড়ি, দেওভোগে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে সশস্ত্র হামলা চালানো হয় আন্দোলনকারীদের উপর। মুহু মুহু গুলি চালায় তারা আন্দোলনকারীদের উপর। এক পর্যায়ে তাদের গুলি ফুরিয়ে এলে ছাত্র-জনতা দখলে নেয় রাজপথ।
বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে সংঘর্ষ। আন্দোলনকারীদের উপর নির্বিচারে গুলির ফলে ফুঁসে উঠে নারায়ণগঞ্জ। এর তীব্র প্রতিক্রিয়ায় গুলি চালানো শামীম ওসমানের ক্যাডার শাহ নিজামের মালিকানাধীন ফতুল্লায় অবস্থিত নাসিম ওসমান মেমোরিয়াল পার্ক (নম পার্ক), গুলি চালানোর আগে নেতাকর্মীদের জড়ো করা ক্যান্টনমেন্টখ্যাত নারায়ণগঞ্জ ক্লাব, আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালানো রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান এসবি গার্মেন্টসহ আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। জালকুড়িতে শামীম ওসমানের মালিকানাধীন বাস কোম্পানি শীতল পরিবহনের ডিপোতে হামলা করে শীতল পরিবহনের ২৬টি বাসে আগুন দেয়া হয়।
২০ জুলাই, শনিবার
এদিন আন্দোলন দমাতে সারাদেশে কারফিউ জারি করা হয়। বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনীও। এর মাঝেই উত্তাল জনতা নারায়ণগঞ্জে টায়ার জ্বালিয়ে, গাছ ফেলে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার পাশাপাশি দুপুরে চিটাগাংরোড ও সাইনবোর্ড এলাকায় জড়ো হতে শুরু করে তারা। চলে তাদের উপর হামলা ও গুলি। তবুও রাজপথেই ছিল আন্দোলনকারীরা।
এক পর্যায়ে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। শিমরাইলের একটি মার্কেটের উপরে শিল্প পুলিশের কার্যালয় থেকে আন্দোলনকারীদের গুলি ছোড়া হলে সেখানে আগুন দেয় বিক্ষোভকারীরা। এতে ভবনটিতে আটকা পড়েন ৩৭ জন পুলিশ সদস্য। পরবর্তীতে হেলিকপ্টার দিয়ে ৩৭ পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে র্যাব।
এদিন বিজিবি ক্যাম্পের অদূরে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত ও ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে গুলিবিদ্ধসহ প্রায় ২০০ জন আহত হন। এদিন হেলিকপ্টার থেকে সাইনবোর্ড ও চিটাগাং রোড এলাকায় আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালানো হয়।
২১ জুলাই, রোববার
এদিনও উত্তপ্ত ছিল নারায়ণগঞ্জ। বিশেষত ঢাকার প্রবেশমুখ চিটাগাংরোড ও সাইনবোর্ডে এদিনও সকাল থেকে বিক্ষোভকারীদের অবস্থান ছিল ব্যাপক। দুপুরে যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করে এসব এলাকায়। এতে দফায় দফায় চলে ব্যাপক সংঘর্ষ।
সমাবেশে ডাক দেয় আওয়ামী লীগ। একই দিন নারায়ণগঞ্জে জনসভার ঘোষণা দিলেও পরে পিছিয়ে আসেন শামীম ওসমান।
৩৫ জুলাই, রোববার (৪ আগষ্ট)
সকাল থেকেই আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠে নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জের প্রায় সকল অলিগলি দখলে নিয়ে নেয় ছাত্র জনতা ও বিএনপি। রাস্তায় ছাত্র জনতার ধাওয়ায় পালিয়ে যায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের আতংকের প্রতীক রাইফেল ক্লাবে হামলা ভাংচুর চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা।
একই সময়ে নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক দখলে নিয়ে নেয় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠন এবং ছাত্র জনতা। নারায়ণগঞ্জ জেলা জুড়ে তীব্র সংঘর্ষ চলতে থাকে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানাসহ বিভিন্ন থানা ও সরকারি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়।
৩৬ জুলাই, সোমবার (৫ আগষ্ট)
সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে শহরের চাষাঢ়া ও আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। রুপায়ন টাওয়ারে অয়ন ওসমানের কার্যালয়ে সকাল থেকেই জড়ো হতে দেখা গেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের।
সকাল দশটার দিকে ঢাকার অভিমুখে লংমার্চে যোগ দিতে জড়ে হতে থাকেন বিএনপি নেতাকর্মীরা ও ছাত্র-জনতা। মিশনপাড়াম চাষাঢ়া, ঢাকা নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড, ঢাকা নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সংযোগ সড়কসহ বিভিন্ন দিক থেকে জড়ো হওয়া ছাত্র-জনতার সাথে এক পর্যায়ে চাষাঢ়া এলাকায় পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এসময় চাষাঢ়া গোল চত্বর এলাকা থেকে তিন দিকে জড়ো হওয়া ছাত্র-জনতার উপর গুলিবর্ষণ করতে থাকে পুলিশ ও ছাত্রলীগ।
সকাল এগারোটার দিকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। এসময় সংঘর্ষে চাষাঢ়া এলাকা রণক্ষেত্রে পরিনত হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান যুবদল নেতা স্বজন।
এদিকে দুপুর বারোটার পর থেকে দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করে। দুপুরের আগেই চাষাঢ়া ত্যাগ করে পুলিশ। এক পর্যায়ে ছাত্র জনতার প্রতিরোধের মুখে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরাও পালাতে বাধ্য হয়। দুপুরে সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের খবর পাওয়ার পর শহরের আশেপাশের এলাকা থেকে চাষাঢ়ার দিকে ছাত্র-জনতার ঢল আসতে শুরু করে।
দুপুর আড়াইটার দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে শেখ হাসিনা পালিয়েছেন। এই সময় পর্যন্ত চষাঢ়ার আশেপাশের এলাকায় অবস্থান করছিলেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তবে সকার পতানের খবর পাওয়ার পর সকলে শহর ত্যাগ করতে থাকেন।
এদিকে সরকারের পতনের খবর পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই চাষাঢ়া এলাকা জনসমুদ্রে পরিনত হয়। এসময় জাতীয় পতাকা হাতে বিজয় উল্লাস করতে দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রায় সকল শ্রেনী পেশার মানুষ এদিন রাজপথে নেমে আসে এই বিজয়ের সাক্ষী হতে। রাত পর্যন্ত মানুষের উল্লাস ও আনন্দ মিছিলে মুখরিত থাকে নারায়ণগঞ্জ। স্বাধীনতার পর এমন বিজয় উল্লাস দেখেনি নারায়ণগঞ্জ।
এরই মাঝে আওয়ামীলীগের ঘাটি খ্যাত রাইফেলস ক্লাবে অগ্নিসংযোগ, শামীম ওসমানদের বাড়িতে ভাংচুর করে বিক্ষুব্ধরা।

