প্রতীকী ছবি
তখন ভোরবেলা; মাইলের পর মাইল কর্দমাক্ত পথ। কোনো যানবাহন নেই; হেঁটে শাড়ির আঁচল সামলে এগিয়ে চলেছেন এক তরুণী। প্রতিদিন সাড়ে তিন কিলোমিটার যাওয়া, একই পথে আবার ফিরে আসা। গন্তব্য একটি ভাঙাচোরা মাটির ঘর, যা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই ভাঙা ঘরের মেঝে নিজ হাতে কাদা-গোবর দিয়ে লেপে, ঝাড়ু দিয়ে শিশুদের বসার উপযোগী করতেন তিনি। তিন দশক আগের সেই তরুণীই আজকের বেবি রেহেনা বিলকিস (বিআর বিলকিস)। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার-হাজারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পেছনে ফেলে যিনি নির্বাচিত হয়েছেন ২০২৬ সালের জাতীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ নারী প্রধানশিক্ষক। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে তিনি গ্রহণ করেছেন শ্রেষ্ঠত্বের স্বর্ণপদক ও সনদ। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ প্রধান শিক্ষকের গল্পটা কোনো সাধারণ সাফল্যের নয়, এটি যেন এক আলোর ফেরিওয়ালার রূপকথা।
বিআর বিলকিসের জন্ম সোনারগাঁ উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের কোনাবাড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। ১৯৮৭ সালে পঞ্চমীঘাট উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন তিনি। লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে ১৯৮৯ সালে এইচএসসিতে প্রথম বিভাগ প্রাপ্ত হন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ পাশ করেন ১৯৯২ সালে। ২০১৫ সালে এমএ (ইতিহাস) পাশ করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। ১৯৯৭ সালে প্রথম বিভাগে সিইনএড সম্পন্ন করেন রায়পুরা পিটিআই থেকে। ২০০৩ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে বিএড এবং ২০১১ সালে এমএড সম্পন্ন করেন।
১৯৯৩ সালে সোনারগাঁয়ের পাকুন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম যোগদান করেন বিআর বিলকিস। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সালে আমগাঁ-বরগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন বদলি হয়ে। ১৯৯৯ সালে সাদিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছিলেন সহকারী শিক্ষক। পরীক্ষা দিয়ে ২০০৩ সালে প্রধানশিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন ওটমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর ২০১০ সালে সাদিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং অদ্যাবধি এখানেই কর্মরত রয়েছেন। শিক্ষকতার এ দীর্ঘ যাত্রায় তিনি কাজ করেছেন সোনারগাঁয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। তিনি যেখানেই গেছেন, সেখানেই ছড়িয়েছেন শিক্ষার আলো। তার ছোঁয়ায় প্রতিটি বিদ্যালয় পেয়েছে নতুন প্রাণ।
বিআর বিলকিস শুধু প্রশাসনিক প্রধান নন, তিনি একজন দূরদর্শী শিক্ষাবিদ। ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর তিনি পড়াশোনার মানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তার কঠোর পরিশ্রম, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং শিক্ষকদের সুনিপুণ সমন্বয়ের ফল হাতেনাতে পায় বিদ্যালয়টি। ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় এ বিদ্যালয় থেকে রেকর্ডসংখ্যক ৩০ শিক্ষার্থী বৃত্তি লাভ করে। ১৯ জন ট্যালেন্টপুল এবং ১১ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি লাভ করে, যা পুরো জেলায় এক অভাবনীয় সাফল্য।
আজকের ভট্টপুর মডেল স্কুল শুধু পাঠ্যবইয়ের পড়ালেখায় সীমাবদ্ধ নয়। বিআর বিলকিস বিশ্বাস করেন, ভালো ফলাফলের চেয়েও ভালো মানুষ হওয়া জরুরি। আর এজন্য তিনি বিদ্যালয়ে চালু করেছেন চমৎকার কিছু উদ্যোগ। কোনো বিক্রেতা নেই, শিশুরা নিজেদের প্রয়োজনীয় খাতা-কলম কিনে বাক্সে টাকা রেখে যায়। আবার কোনো শিক্ষার্থীর কিছু হারিয়ে গেলে বা কেউ কোনো কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস পেলে এখানে জমা দেয়। শিক্ষার্থীরা সারাদিন কী কী ভালো কাজ করল, তা ডায়েরিতে লিখে রাখে। সে ডায়েরির নাম-ভালো কাজের ডায়েরি। পাশাপাশি প্রতিদিন সত্য বলার অভ্যাস, প্রতিদিন ক্লাসের শুরুতে শিক্ষার্থীদের অন্তত একটি সত্য কথা বলা এবং সারা দিন সত্যের পথে থাকার শপথ করান বিআর বিলকিস। তার এসব উদ্যোগ শৈশবেই শিশুদের মনে সততার আলো ছড়িয়ে দেয়।
এর আগেও তিনি স্থানীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন বহুবার। উপজেলা পর্যায়ে ১২ বার সোনারগাঁ উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধানশিক্ষক, জেলা পর্যায়ে ৮ বার নারায়ণগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধানশিক্ষক, বিভাগীয় পর্যায়ে ৪ বার ঢাকা বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধানশিক্ষক হয়েছেন তিনি। সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ে ২০২৬ সালের শ্রেষ্ঠ প্রধানশিক্ষক (মহিলা) হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পদক গ্রহণ।
জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হওয়ার দৌড়ে তিনি প্রাথমিকভাবে সোনারগাঁয়ের ৬টি ক্লাস্টারের প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে উপজেলায় শ্রেষ্ঠ হয়েছেন; পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার ৫টি উপজেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেলায় শ্রেষ্ঠ হয়েছেন। সেখান থেকে ঢাকা বিভাগের ১৩ জেলার অংশগ্রহণে বিভাগের শ্রেষ্ঠ হয়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করেছেন এবং জাতীয় পর্যায়ে ৮ বিভাগের সেরা ৮ প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধানশিক্ষক (নারী) হিসাবে পুরস্কার লাভ করেছেন।
গ্রামের কাদা-মাটি মাখা স্কুল থেকে উঠে এসে আজ দেশসেরা শিক্ষকের আসনে বসা বিআর বিলকিস দেশের লাখো নারীর অনুপ্রেরণা। কর্মক্ষেত্রে মেধা, ধৈর্য আর সততা থাকলে যে কোনো বাধা টপকে যাওয়া যায়, তিনি তার জীবন্ত প্রমাণ। তাই অনেকের মতে, বিআর বিলকিস শুধু একজন শিক্ষক নন; একইসঙ্গে তিনি যেন এক বাতিঘর।

