ফাইল ছবি
শোরুম ও কারখানায় সারি সারি সাজিয়ে রাখা বাহারি ও নজরকাড়া ডিজাইন আর নিখুঁত কারুকাজের জামদানি শাড়ি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। ঘুরে ঘুরে পছন্দের শাড়ি কিনছেন তারা। বেচাকেনা ভালো হওয়ায় বেশ খুশি বিক্রেতারা। রোববার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের নোয়াপাড়া বিসিক শিল্পনগরী ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ঈদ সামনে রেখে শতকোটি টাকার বেচাকেনা হবে বলে আশা করছেন তাঁতি ও শোরুমের মালিকরা।
ঈদ সামনে রেখে জামদানি তাঁতশিল্পের কারিগরদের নির্ঘুম রাত কাটছে। ক্রেতাদের চাহিদা মাথায় রেখে বাহারি ডিজাইনে তারা শাড়ি, থ্রি-পিস, টু-পিস পাঞ্জাবিসহ নানা পোশাক তৈরি করছেন। রূপগঞ্জের তারাব নোয়াপাড়া বিসিক শিল্পনগরী ও রূপসী এলাকায় কয়েকশ জামদানি তাঁতি হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছেন। নোয়াপাড়া, রূপসী, দক্ষিণ রূপসী, সোনারগাঁয়ের মজুমপুরে ঘরে ঘরে জামদানি তৈরি হয়। রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে তৈরি জামদানি শাড়ি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শপিংমল ও মার্কেটের বিপণিবিতানে সরবরাহ করা হয়।
শীতলক্ষ্মা নদীর তীরে রূপগঞ্জের তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া বিসিক শিল্পনগরী মূলত জামদানিপল্লি বা বিসিক জামদানি শিল্পনগরী হিসাবে পরিচিত। কার্পাস তুলা ও রেশম সুতা দিয়ে শত শত তাঁতি নিপুণ হাতে জামদানি শাড়িসহ নানা পোশাক তৈরি করেন। হস্তচালিত তাঁতপণ্য জামদানি সুতা দিয়ে নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। যে শাড়ির কাজ যত নিখুঁত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত সে শাড়ির দাম তত বেশি। রেশম সুতা জাপান, চীন, ভারত থেকে আমদানি করা হয়। ঈদ সামনে রেখে জামদানিতে সেবর কাজল, চেইন তেসরি, ছিটার জাল, চাক্কাফুল, স্বদেশ ফুল, গুডফুলা, বিলারা ফুল, তাবিজ জাল, ডালিম পাইর, তারাফুল, পেনা, জবা, স্তক, পয়সা, নজা ফুল, জুঁই ফুল, আম তেছরি, কলকা, মারিচ ফুল, ছপাক্টি, তেপাতিসহ নানা ডিজাইন তাঁতিরা ফুটিয়ে তুলছেন।
জানা যায়, কারিগর সংকটে মসলিন খ্যাত জামদানি শিল্প অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। কারিগরদের অভিযোগ-সপ্তাহব্যাপী হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তারা শাড়ি তৈরি করলেও উপযুক্ত পারিশ্রমিক পান না। আর যে পারিশ্রমিক পান তা দিয়ে সংসার চালানোও দায়। আবার সঠিক মজুরি না পাওয়ায় এ পেশায় কেউ আসতে চায় না। তারা বলেন, অর্থের অভাবে তারা সন্তানদের পড়াশোনাও করাতে পারছেন না।
জামদানি কারিগর বিল্লাল হোসেন জানান, একটি ভালোমানের শাড়ি তৈরি করতে হেলপারসহ একজন কারিগরের ১২ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। কিন্তু সে তুলনায় যে মজুরি পাওয়া যায়, তা খুবই অপ্রতুল। খুব ছোটবেলা থেকে এ কাজ শিখেছি। আর কোনো কাজ করতে পারি না বলে এ পেশায় লেগে আছি। তবে অনেকে পেশা পরির্বতন করে অটোরিকশা বা অন্য কাজ করছেন। এ কারণে ভালো কারিগর পাওয়া যায় না। নারী শ্রমিক আসমা বেগম বলেন, ঘরের অভাব-অনটন ঘোচাতে ছোট বেলায় এ কাজ শিখেছি। কিন্তু ঘরের অভাব দূর হয় না। কারণ, পরিশ্রম অনুযায়ী যে টাকা মজুরি পাই, তা দিয়ে কোনোমতো দিনযাপন করছি। আরেক শ্রমিক সামসুল হক বলেন, জীবনে কতশত জামদানি তৈরি করেছি, তার হিসাব নেই। কিন্তু নিজের স্ত্রীকে একটি শাড়িও পরাতে পারিনি। যে টাকা মজুরি পাই, তা দিয়ে দু-বেলা ভাত খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি। ছেলে-মেয়েকে ভালো একটা স্কুলে পড়াতে পারিনি। বিসমিল্লাহ জামদানি হাউজের স্বত্বাধিকারী মনির হোসেন জানান, ভালোমানের একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে যে টাকা খরচ হয়, সেই দাম ক্রেতারা দিতে চান না। এ কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এছাড়া কারিগর সংকটও রয়েছে। সোহাগ জামদানি ঘরের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম জানান, ঈদ সামনে রেখে এবার ঢাকার শপিংমলগুলোয় জামদানি শাড়ির বেশ চাহিদা আছে। কিন্তু অর্থের অভাবে চাহিদামতো শাড়ি সরবরাহ করতে পারছি না। ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প হিসাবে ব্যাংক থেকে আমরা সহযোগিতা পাই না। জামদানি শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে প্রণোদনা প্রয়োজন। এছাড়া প্রতিবছর রং ও সুতা দাম বাড়ছে। ফলে স্বল্পপুঁজিতে ব্যবসা করে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে মেশিনে উৎপাদিত শাড়ির কাছে হাতে বোনা শাড়ি মার খাচ্ছে। মেশিনে উৎপাদিত জামদানি শাড়ি ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে তিন হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে হাতে বোনা মোটা জামদানি শাড়ি উৎপাদন করতেই আমাদের তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ পড়ে। ঢাকা বিভাগে জামদানির উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র রূপগঞ্জের বিসিক শিল্পনগরী। ব্যবসায়ী ও কারিগররা জানান, একটি সাধারণ মানের জামদানি শাড়ি তৈরি করতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। আর উন্নতমানের শাড়ি তৈরিতে ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ সময় লাগে। ৪০ থেকে ৬০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করে মোটাজাতের জামদানি শাড়ি তৈরি করা হয়। এর দাম ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৭/৮ হাজার টাকা রাখা হয়। ৬০ থেকে ৮০ কাউন্টের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায় বেচাকেনা হয়। আবার ৮০ থেকে ৮৪ কাউন্ট বা ১০০ কাউন্টের অধিক ১২০ কাউন্টের সুতা দিয়ে বুনা শাড়ি ২০ হাজার থেকে ৪০-৪৫ হাজার টাকায় বেচাকেনা হয়।
জানা যায়, বড় বড় শপিংমলের দোকানিরা সরাসরি তাঁতিদের কাছ থেকে শাড়ি কিনেন না। তারা মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, টু-পিসসহ বিভিন্ন পোশাক কেনে। এ কারণে মধ্যস্বত্বভোগীরা মোটা অঙ্কের মুনাফা করছে। নোয়াপাড়া বিসিক শিল্পনগরীতে প্রতি শুক্রবার ভোর থেকে জামদানি শাড়ির হাট বসে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এখানে আসেন। হাটে তাঁতিদের কাছ থেকে তারা সরাসরি শাড়ি কেনেন। এছাড়া নোয়াপাড়া এলাকায় অর্ধশত জামদানি শাড়ির শোরুম গড়ে উঠেছে। এসব শোরুমের স্টিলের আলমিরা, কাচের ক্যাবিনেট, শোকেজে জামদানি শাড়ি প্রদর্শন করা হয়। শোরুম থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানের ক্রেতারা পছন্দের শাড়ি সংগ্রহ করেন।

