শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫

|

ভাদ্র ১৩ ১৪৩২

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

নির্বাচন স্পেশাল- নারায়ণগঞ্জ ৫ (সদর-বন্দর)

নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনে প্রস্তুত প্রার্থীরা, আসন পেতে মরিয়া বিএনপি-জামায়াত

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ২১:৪১, ২৯ আগস্ট ২০২৫

নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনে প্রস্তুত প্রার্থীরা, আসন পেতে মরিয়া বিএনপি-জামায়াত

ফাইল ছবি

নারায়ণগঞ্জে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিসসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি সেলিম ওসমান দৃশ্যপটে না থাকলেও আসনটিতে জাতীয় পার্টির শক্ত অবস্থান রয়েছে।  

এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে নানা সমীকরণ কষতে শুরু করেছেন ভোটার ও প্রার্থীরা। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আগামী নির্বাচনে দলটির কোন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে এই আসনটিতে বিএনপির সাথে অন্যান্য ইসলামিক দল ও জাতীয় পার্টির প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঐতিহাসিক ও ভৌগলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণঃ
নারায়ণগঞ্জ জেলা শহর ও বন্দরের একাংশ নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের একাংশ এই আসনের অধীনে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ সকল সরকারি, বেসরকারি স্থাপনা এই এলাকাতেই অবস্থিত। পাশাপাশি দেশের অন্যতম বৃহৎ নদীবন্দরও এই এলাকাতে রয়েছে।  ফলে শুধু শিল্পাঞ্চল হিসেবে নয় ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ভৌগলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে এই এলাকার জাতীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ।

সড়ক ও নদীপথ উভয় যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে সহজেই ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যুক্ত। বর্তমানে এই এলাকাটি বাংলাদেশের অন্যতম শিল্প ও গার্মেন্টস হাব হিসেবে পরিচিত। অসংখ্য টেক্সটাইল, ডাইং ও রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখছে।

ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা হওয়ায় এলাকাটির রাজনৈতিক গুরুত্বও অনেক বেশি। ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘেঁষা এই এলাকাটি বিগত সময়ের আন্দোলন সংগ্রামেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এ আসনে বিগত সকল নির্বাচনে যারা ছিলেন নির্বাচিতঃ
১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন একেএম নাসিম ওসমান। ১৯৮৮ সালে দল বদল করে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে এমপি হন নাসিম ওসমান। ১৯৯১ সালে ধানের শীষ নিয়ে এ আসন থেকে এমপি হন বিএনপির আবুল কালাম। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও এমপি হন বিএনপির আবুল কালাম। ১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে আসনটি থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এসএম আকরাম এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে আসনটি থেকে পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির আবুল কালাম। ২০০৮ সালে আসনটিতে বিজয়ী হন জাতীয় পার্টির নাসিম ওসমান। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনেও জাতীয় পার্টির নাসিম ওসমান এমপি হন। ২০১৪ সালে উপ নির্বাচনে এ আসন থেকে এমপি হন সেলিম ওসমান। পরবর্তীতে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে বিতর্কিত নির্বাচনেও জাতীয় পার্টির মনোনয়নে এমপি হন সেলিম ওসমান।

নারায়ণগঞ্জ-৫ ভোটার কত?
২০২৪ সালের নির্বাচনের হিসাব অনুযায়ী এ আসনে মোট ভোটার ৪ লক্ষ ৯৬ হাজার ৪০০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লক্ষ ৪৯ হাজার ৩৬৮ জন এবং নারী ভোটার ২ লক্ষ ৪৫ হাজার ২৬ জন। আসনটিতে উভয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৬ জন।

হত্যা মামলার আসামি হয়ে নীরব সেলিম ওসমান
নারায়ণগঞ্জে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ছাত জনতার উপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ওসমান পরিবারের সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি একেএম সেলিম ওসমান। তিনি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের তিন বারের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। পাঁচ আগষ্ট আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
 
তবে তার একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, তিনি তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। 

আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময় জাতীয় পার্টির নেতা হলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের চেয়ে বেশি প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল সেলিম ওসমানের। জাতীয় পার্টির নেতা হয়েও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হয়ে উঠেন সেলিম। ২০২৪ সালের নির্বাচনে সেই সুবাদে সেলিম ওসমানের আসনে কোন প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে পুরে সময়জুড়ে নারায়ণগঞ্জকে নিয়ন্ত্রনে রেখেছিলেন সেলিম ওসমান। ব্যাবসায়ীরা তার নিয়ন্ত্রনে থাকতো। গার্মেন্টস ব্যাবসায়ীদের অন্যতম সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি পদে তিনি ছিলেন দীর্ঘদিন। তার নির্বাচনী প্রচারণায় জাতীয় পার্টি ছাড়াও আওয়ামীলীগসহ একাধিক রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের দেখা গেছে। 

যারা প্রার্থী হতে পারেন আগামী নির্বাচনে
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি আবুল কালাম আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এছাড়াও এ আসনে বিএনপির মনোনয়নের দৌড়ে আলোচনায় আছেন বিএনপি নেতা মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু, ব্যবসায়ী ও মডেল গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুদুজ্জামান মাসুদ, ব্যাবসায়ী ও প্রাইম গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রাইম বাবুল। অন্যদিকে এ আসনে জামায়াতের একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন মাওলানা মাইনুদ্দিন আহমেদ। এছাড়াও খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি মাসুম বিল্লাহ এ আসন থেকে নির্বাচন করবেন।

আবুল কালাম
আবুল কালাম নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ওসমান পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য নাসিম ওসমান ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মোকাবিলা করেই প্রতিবার এমপি হন কালাম। ছিলেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সভাপতি। দলীয় আন্দোলন সংগ্রামেও বিগত সময়ে কালাম ও তার অনুসারীরা সামনের সারিতে ছিলেন। দীর্ঘদিন এমপি থাকলেও কালামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ নেই। পাশাপাশি নিজ এলাকায় তার ব্যাপক জনপ্রিয়তাও রয়েছে। ফলে আসন্ন নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনয়নের জন্য আলোচনায় আছেন।

মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়নের ক্ষেত্রে আলোচনায় আছেন মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি নেতা মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন জুড়ে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও খোরশেদের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। দেশব্যাপী তার সুনাম ও সুখ্যাতি রয়েছে। ফলে আসন্ন নির্বাচনে তিনিও ধানের শীষের কান্ডারি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

সাখাওয়াত হোসেন খান
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়নের জন্য আলোচনায় আছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। বিগত আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জ মহানগরীতে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন সাখাওয়াত। এর আগে ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি।

আবু আল ইউসুফ খান টিপু
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়নের দৌড়ে আছেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু। বিগত আন্দোলনে টিপুর নেতৃত্বে সক্রিয় ছিল মহানগর বিএনপি। হরতাল অবরোধের মত কর্মসূচিতে মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিতেন টিপু। মিছিল থেকেই একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয় টিপুকে।
 
মাসুদুজ্জামান মাসুদ
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নের আলোচনায় আছেন মাসুদুজ্জামান মাসুদ ওরফে মডেল মাসুদ। ইতিমধ্যে নিজ এলাকায় নিয়মিত প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। 

মাঈনউদ্দিন আহমদ
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য মাওলানা মাঈনউদ্দিন আহমদ। পাঁচ আগষ্টের পর থেকেই এই এলাকায় নিয়মিত প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর সাথে মাইনউদ্দিনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
 
মুফতি মাসুম বিল্লাহ
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন মহানগর ইসলামী আন্দোলনের সভাপতি মুফতি মাসুম বিল্লাহ। তিনি একাধিকবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। নির্বাচনকে ঘিরে নিয়মিত নিজ এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন তিনি।

এবিএম সিরাজুল মামুন
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে খেলায়েত মজলিসের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এবিএম সিরাজুল মামুন। এর আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

কি ভাবছেন ভোটাররাঃ
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যে নানা হিসেব নিকেশ কষতে শুরু করেছেন ভোটাররা। দীর্ঘদিন ভোট দিতে না পারায় আগামী নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ ভোটারদের মাঝে রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের যারা এখনও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি তারা ভোট দিতে অনেকটা মুখিয়ে আছেন। নির্বাচনের সময় সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত ও সংঘাত এড়াতে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান তাদের।

নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিঃ
অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন অফিসার মোঃ রাকিবুজ্জামান (রেনু) জানান, আমাদের ভোটার তালিকা হালনাগাদ শেষ। তালিকা প্রস্তুত। আমরাও প্রস্তুত। আমাদের লোকবল বা অন্য কোন সমস্যা নেই। এখন পর্যন্ত পরিবেশও স্বাভাবিক আছে। কোন ধরনের থ্রেড (হুমকি) নেই।