
ফাইল ছবি
ঐতিহাসিক ও ভৌগলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণঃ
নারায়ণগঞ্জ জেলার অন্যতম জনবহুল ও শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা ফতুল্লা। এটি শুধু একটি ইউনিয়ন বা শিল্পাঞ্চল নয় ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ভৌগলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে ফতুল্লা এখন জাতীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ এক নাম। ফতুল্লা ঢাকার লাগোয়া হওয়ায় রাজধানীর শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে অন্যতম প্রধান সাপোর্টিং জোন হিসেবে বিবেচিত। সড়ক ও নদীপথ উভয় যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় ফতুল্লা সহজেই নারায়ণগঞ্জ শহর, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যুক্ত। বর্তমানে ফতুল্লা বাংলাদেশের অন্যতম শিল্প ও গার্মেন্টস হাব হিসেবে পরিচিত। অসংখ্য টেক্সটাইল, ডাইং ও রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখছে।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা হওয়ায় এলাকাটির রাজনৈতিক গুরুত্বও অনেক বেশি। ঢাকার অন্যতম প্রবেশপথ সাইনবোর্ড ও পাগলা এই ফতুল্লা এলাকায় অবস্থিত। বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে এই এলাকা দুটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে সবসময়ই।
এ আসনে বিগত সকল নির্বাচনে যারা ছিলেন নির্বাচিতঃ
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসটিতে ঐতিহাসিক ভাবে বিএনপির শক্তিশালী অবস্থান ছিল। আওয়ামী লীগেরও এ আসনে একাধিক জয় রয়েছে। ১৯৮৬ সালে প্রথমবারের মত আসনটিতে এমপি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির আবদুস সাত্তার। ১৯৯১ সালে বিএনপির সিরাজুল ইসলাম এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির এমপি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ আলী। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি হন একেএম শামীম ওসমান। ২০০১ সালে শামীম ওসমানকে হারিয়ে আসনটিতে বিজয়ী হন বিএনপির প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সারাহ্ বেগম কবরী সারোয়ার এ আসনটি পুনরুদ্ধার করে বিজয় লাভ করেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টানা তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে এ আসন থেকে এমপি হন শামীম ওসমান।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ভোটার কত?
২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী আসনটির মোট ভোটার ৬ লক্ষ ৯৬ হাজার ১৩৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩ লক্ষ ৪৩ হাজার ৬৯২ জন এবং নারী ভোটার ৩ লক্ষ ৫২ হাজার ৪৪১ জন।
আন্দোলনে গুলি চালিয়ে দেশছাড়া শামীম ওসমান
নারায়ণগঞ্জে জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে পতন ঘটে ওসমান পরিবারের। দেড় দশকের জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পায় নারায়ণগঞ্জবাসী। বিভিন্ন সময় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে খেলা হবে সহ নানা হুংকার দিয়ে আসলেও খেলা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই পালিয়ে যান শামীম ওসমান।
নারায়ণগঞ্জে ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সশস্ত্র হামলা চালান শামীম ওসমান ও তার অনুসারীরা। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি হামলায় অংশ নেন শামীম ওসমানের পুত্র অয়ন ওসমান, শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটু, বেয়াই সালাউদ্দিন লাভলু ও অয়নের শ্যালক ভিকিসহ অসংখ্য নেতাকর্মী।
শহরের রাইফেল ক্লাব থেকে লুট করে অত্যাধুনিক বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শামীম ওসমান। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে ডিআইটি এলাকায় অস্ত্র নিয়ে গুলিবর্ষণ করেন এবং তান্ডব চালান শামীম ওসমান।
যারা প্রার্থী হতে পারেন আগামী নির্বাচনেঃ
আসন্ন নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন আসনটির সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। ২০০১ সালে তৎকালীন প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানকে হরিয়ে এমপি হন তিনি। আলোচনায় আছেন ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শাহ্ আলম। সক্রিয় আছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদ ও যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব। আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে চান জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মনির হোসেন কাসেমী। আসনটিতে বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা আব্দুল জব্বার। আসনটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পারেন আব্দুল্লাহ আল আমিন।
মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন আসনটির সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। ২০০১ সালে শামীম ওসমানকে হারিয়ে এ আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে এমপি পদে জয়ী হন গিয়াসউদ্দিন। সরকার পতনের আন্দোলনের চূড়ান্ত সময়ে জেলা বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন গিয়াসউদ্দিন। আসন্ন নির্বাচনে এ আসনটি থেকে এমপি পদে বিএনপির মনোনয়নের জন্য এগিয়ে আছেন তিনি।
শাহ্ আলম
আসন পুনর্বিন্যাসের খসড়া প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছেন শাহ্ আলম। ফতুল্লা অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ায় এগিয়ে আছেন তিনি। ২০০৮ সালে এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করেন তিনি৷ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কবরীর কাছে হেরে যান তিনি।
মামুন মাহমুদ
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন মামুন মাহমুদ। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জেলার পাঁচটি আসনে নির্বাচনী প্রচার প্ররণায় দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
মাসুকুল ইসলাম রাজীব
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আলোচনায় আছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব। রাজীব তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের সর্বশেষ নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। দলের ভেতরে ও বাইরে তরুণ এই নেতার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে জেলাজুড়ে। পাঁচ আগষ্টের পর থেকে কোন বিতর্ক ছুঁতে পারেনি এই তরুণ বিএনপি নেতাকে।
মনির হোসাইন কাসেমী
২০১৮ সালের নির্বাচনের বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন মনির হোসাইন কাসেমী। সেসময় কেন্দ্রগুলোতে এজেন্টও দিতে পারেননি এই প্রার্থী। আগামী নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চান কাসেমী।
আব্দুল জব্বার
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা আব্দুল জব্বার। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে আব্দুল জব্বারকে। তিনি সামাজিক, নাগরিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। এ ছাড়াও নিয়মিত গণসংযোগ, উঠান বৈঠক করছেন এ নেতা।
আব্দুল্লাহ আল আমিন
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পারেন আব্দুল্লাহ আল আমিন। নবগঠিত এ দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব তিনি।
কি ভাবছেন ভোটাররাঃ
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যে নানা হিসেব নিকেশ কষতে শুরু করেছেন ভোটাররা। দীর্ঘদিন ভোট দিতে না পারায় আগামী নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ ভোটারদের মাঝে রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের যারা এখনও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি তারা ভোট দিতে অনেকটা মুখিয়ে আছেন। নির্বাচনের সময় সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত ও সংঘাত এড়াতে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান তাদের।
নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিঃ
অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন অফিসার মোঃ রাকিবুজ্জামান (রেনু) জানান, আমাদের ভোটার তালিকা হালনাগাদ শেষ। তালিকা প্রস্তুত। আমরাও প্রস্তুত। আমাদের লোকবল বা অন্য কোন সমস্যা নেই। এখন পর্যন্ত পরিবেশও স্বাভাবিক আছে। কোন ধরনের থ্রেড (হুমকি) নেই।