
ফাইল ছবি
ঐতিহাসিক ও ভৌগলিকভাবে সোনারগাঁ গুরুত্বপূর্ণঃ
ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই সোনারগাঁয়ের গুরুত্ব অনেক। এটি বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং শিল্পকলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। মধ্যযুগে সোনারগাঁ মুসলিম সুলতানদের রাজধানী ছিল এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী বন্দর ছিল। সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য এবং লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর এটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, সোনারগাঁ একসময় মুসলিম সুলতানদের রাজধানী ছিল এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। এখানে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও স্থাপনা রয়েছে, যেমন - গোয়ালদী মসজিদ, পানাম নগর, এবং শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর।
ভৌগলিকভাবে, সোনারগাঁ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার কাছে এবং বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি অবস্থিত, যা এটিকে একটি কৌশলগত অবস্থানে এনে দিয়েছে। একসময় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী বন্দর ছিল, যা বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।
দেশের লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কও এই সোনারগাঁয়ের ওপর দিয়ে ঢাকাকে দক্ষিণ বঙ্গের সাথে সংযুক্ত করেছে। ফলে রাজনৈতিক ভাবেও এই অঞ্চলের গুরুত্ব অনেক বেশি। পাশাপাশি মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকা হওয়ায় এই এলাকা ঘিরে অনেক শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। ফলে এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও অনেক বেশি।
এ আসনে বিগত সকল নির্বাচনে যারা ছিলেন নির্বাচিতঃ
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন ঐতিহাসিক ভাবেই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি জাতীয় পার্টিরও এই আসনে অবস্থান রয়েছে। জোটের রাজনীতির কারণে আসনটিতে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থান আওয়ামী লীগের। ১৯৮৬ সালে আসনটিতে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হন মোবারক হোসেন। ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির আবু নূর মোহাম্মদ বাহাউল হক আসনটিতে এমপি নির্বাচিত হন। পরবর্তী ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা চারবার আসনটি থেকে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী রেজাউল করিম। ২০০৮ সালে আসনটিতে প্রথমবারের মত জয় পান আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ আসনটি ছেড়ে দিলে জাতীয় পার্টির লিয়াকত হোসেন খোকা আসনটি থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনেও লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি হন এ আসনে। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আসনটিতে পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত।
সোনারগাঁয়ে ভোটার কত?
২০২৪ সালের নির্বাচনের তথ্যমতে আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার ৬৩৮ জন। আসনটিতে পুরুষ ভোটার ১ লক্ষ ৭৮ হাজার ১৪৯ জন এবং নারী ভোটার ১ লক্ষ ৬৭ হাজার ৪৮৯ জন।
ওসমান পরিবারের আশীর্বাদে এমপি হয়ে সোনারগাঁয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন খোকাঃ
নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের এমপিরা দেশ ছেড়ে পালালেও দেশে রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন সোনারগাঁয়ের সাবেক এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা। নারায়ণগঞ্জে তাকে খুব একটা দেখা না গেলেও ঢাকায় জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন খোকা। ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত খোকাকে ওসমানরা ব্যাবহার করেছিলেন সোনারগাঁ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব কায়েম রাখতে।
২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় থেকে এমপি নির্বাচিত হন খোকা। জাতীয় পার্টির রাজনীতি করলেও ওসমান পরিবারের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন খোকা। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমানের কাছের কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। ওসমান পরিবারের তদবিরেই ২০১৪ সালের নির্বাচনে সোনারগাঁ আসন জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। বিতর্কিত সেই নির্বাচনে এমপি হন খোকা।
২০২৪ সালের পাঁচ আগষ্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সকল নেতাকর্মী ও সাবেক এমপিরা পালিয়ে গেলেও এখনও বহাল তবিয়তে আছেন লিয়াকত হোসেন খোকা।
২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা দশ বছর সোনারগাঁয়ের এমপি ছিলেন খোকা। এসময় সোনারগাঁয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন খোকা। লুটপাট ও দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান খোকা।
দুর্নীতির পাশাপাশি নানা সন্ত্রাসী কার্যক্রমেও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে খোকা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে পুরো উপজেলায় সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলেন খোকা। এসকল বাহিনীর মাধ্যমে পুরো সোনারগাঁ নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। সোনারগাঁয়েী বিভিন্ন ইউনিয়নে ওসমান পরিবারের অনুসারী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের নেতৃত্ব দিতেন খোকা। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় পাঁচ আগষ্টের পর থেকে সোনারগাঁয়ে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি খোকাকে। সোনারগাঁয়ে মামলার আসামি হওয়ায় ঢাকায় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন খোকা। ইতিমধ্যে ঢাকায় জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকটি মিছিলে সামনের সারিতে দেখা গেছে খোকাকে।
যারা প্রার্থী হতে পারেন আগামী নির্বাচনেঃ
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন বিএনপির দুই হেভিওয়েট প্রার্থী। আসনটিতে বিএনপির মনোনয়নে এগিয়ে আছেন সোনারগাঁ থানা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান। এছাড়াও আলোচনায় আছেন আসনটির টানা চারবারের সাংসদ রেজাউল করিম।
আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়াও শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। এছাড়াও এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে ফারুক আহমদ মুন্সীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
জাপা নির্বাচনে গেলে আসনটি থেকে আগামী নির্বাচনে মাঠে দেখা যেতে পারে এ আসনের সাবেক দুই বারের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকাকে। এর বাইরে আসনটি থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মামুনুল হককেও এ আসনে প্রার্থী হিসেবে দেখা যেতে পারে।
আজহারুল ইসলাম মান্নানঃ
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বিএনপির আজহারুল ইসলাম মান্নান। তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যের পাশাপাশি সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি। বিগত ১৭ বছর যাবৎ এই এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের আগলে রেখেছেন মান্নান। সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন মান্নান। দীর্ঘদিন সক্রিয় ভাবে মাঠে থাকায় আগামী নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নের জন্য এগিয়ে আছেন তিনি।
রেজাউল করিমঃ
সোনারগাঁ থেকে বিএনপির মনোনয়নের ক্ষেত্রে আলোচনায় আছেন রেজাউল করিমও। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর পাঁচ আগষ্টের পরে সক্রিয় হয়েছেন তিনি। নিয়মিত নির্বাচনী এলাকায় সভা সমাবেশ করছেন তিনি। এই আসন থেক টনাা চারবারের এমপি ছিলেন রেজাউল করিম।
ওয়ালিউর রহমান আপেলঃ
সোনারগাঁয়ে বিএনপির মনোনয়নের জন্য আলোচনায় আছেন বিএনপি নেতা ওয়ালিউর রহমান আপেলও। কেন্দ্রে লবিং করলেও মাঠে তেমন সক্রিয়তা নেই তার।
ইমতিয়াজ মাহমুদ বকুলঃ
সোনারগাঁ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইতে পারেন ইমতিয়াজ মাহমুদ বকুলও। ইতিমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় পোস্টার ফেস্টুন ও বিলবোর্ডে প্রচারণা শুরু করেছেন তিনি। নির্বাচন ঘনিয়ে আসলে শক্তভাবে মাঠে নামতে পারেন তিনি।
ড. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়াঃ
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে আসন্ন নির্বাচনে এমপি পদে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন ড. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া। ইতিমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত প্রচার প্রচারণা ও সভা সমাবেশ করছেন তিনি। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সাধারণ মানুষের দ্বারে ঘুরছেন তিনি। আগামী নির্বাচনে বিএনপির সাথে জামায়তের ইকবাল হোসেনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লিয়াকত হোসেন খোকাঃ
আসন্ন নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে প্রার্থী হতে পারেন লিয়াকত হোসেন খোকা। তবে মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় নিজ এলাকায় আসতে পারছেন না তিনি। ঢাকা থেকেই বর্তমানে রাজনীতি করছেন খোকা। তবে নির্বাচনের সময় এ আসনে তিনি সক্রিয় হতে পারেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসঃ
আগামী নির্বাচনে সোনারগাঁয়ে প্রার্থী হতে পারেন মাওলানা মামুনুল হক। পাঁচ আগষ্টের পর এ আসনে বেশ কয়েকটি সভা সমাবেশে মামুনুল হককে দেখা গেছে।
কি ভাবছেন ভোটাররাঃ
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যে নানা হিসেব নিকেশ কষতে শুরু করেছেন ভোটাররা। দীর্ঘদিন ভোট দিতে না পারায় আগামী নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ ভোটারদের মাঝে রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। বিশেষ করে তরুণ ভেটারদের যারা এখনও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি তারা ভোট দিতে অনেকটা মুখিয়ে আছেন।
এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের কন্ঠেও এবার পরিবর্তনের বার্তা রয়েছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের পতনের পর এবার ভোট নিয়ে বেশ সচেতন সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি নির্বাচনের সময় সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত ও সংঘাত এড়াতে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান তাদের।
নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিঃ
অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন অফিসার মোঃ রাকিবুজ্জামান (রেনু) জানান, আমাদের ভোটার তালিকা হালনাগাদ শেষ। তালিকা প্রস্তুত। আমরাও প্রস্তুত। আমাদের লোকবল বা অন্য কোন সমস্যা নেই। এখন পর্যন্ত পরিবেশও স্বাভাবিক আছে। কোন ধরনের থ্রেড (হুমকি) নেই।