
ফাইল ছবি
ঐতিহাসিক ও ভৌগলিকভাবে রূপগঞ্জ গুরুত্বপূর্ণঃ
নারায়ণগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী রূপগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-১ আসন। বৃটিশ আমল থেকেই ব্যাবসা-বানিজ্য ও মসলিন, জামদানির মত শিল্পের জন্য রূপগঞ্জ ছিল বিখ্যাত। মোট সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ উপজেলা। ঢাকার উপকন্ঠে এবং একই সাথে বাংলাদেশের লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘেষা রূপগঞ্জের অবস্থান। ফলে রাজনৈতিক ভাবেও এ আসনটির গুরুত্ব অনেক বেশি।
এছাড়াও দেশের বৃহৎ কাপড়ের বাজার হিসেবে পরিচিত গাউছিয়া মার্কেটও এই উপজেলায়। পাশাপাশি এখানে পল্টন সিটি, বড় বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও গার্মেন্টস হাব রয়েছে। এর ফলে এলাকার ভোটারদের মধ্যে শিক্ষিত তরুণ ও শ্রমিক শ্রেণির প্রাধান্য তৈরি করেছে।
এ আসনে বিগত সকল নির্বাচনে যারা ছিলেন নির্বাচিতঃ
১৯৮৬ সাল থেকে সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আসনটিতে একসময় শক্তিশালী অবস্থানে ছিল বিএনপি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মতিন চৌধুরী এই আসন থেকেই নির্বাচন করতেন। তার মৃত্যুর পর আসনটি আর উদ্ধার করতে পারেনি বিএনপি। পরপর তিনটি নির্বাচনের মাধ্যমে যেগুলো রাতের ভোট ও ভোটারহীন নির্বাচন খ্যাত সে নির্বাচনে আসনটি কব্জায় করে রেখেছিল আওয়ামী লীগের গোলাম দস্তগীর গাজী। তবে পাঁচ আগষ্টের পট পরিবর্তনের পর আসনটি পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া বিএনপি।
এর আগে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে আসনটিতে এমপি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন সুলতান উদ্দিন ভূঁইয়া। ১৯৯১ সালে এ আসনে নির্বাচিত হন আব্দুল মতিন চৌধুরী। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আসনটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কাজী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ বিজয়ী হন। ২০০১ সালে পুনরায় আসনটি উদ্ধার করেন মতিন চৌধুরী। সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজী নির্বাচিত হন। এরপর থেকে আসনটিতে গ্রহনযোগ্য ভোট হয়নি বলে জানান ভোটাররা। পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে গাজীই আসনটিতে এমপি হয়ে আসছিলেন।
রূপগঞ্জের ভোটার কত?
সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আসনটিতে ভোটার হালনাগাদে দেখা যায়, মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ ২৩ হাজার। আসনটিতে নতুন আরও ৫০ হাজার তরুণ ভোটার যুক্ত হচ্ছেন আগামী নির্বাচনের আগে।
আসনটিতে ২০০৮ সাল থেকে টানা প্রায় সতেরো বছর এমপি ছিলেন গোলাম দস্তগীর গাজী। মাঝে ২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও ক্রমেই দানবে পরিনত হন গাজী।
একটা সময় রূপগঞ্জের নামই যেন বদলে গাজীগঞ্জ করে ফেলতে চেয়েছিলেন তিনি। রূপগঞ্জের বিভিন্ন সড়ক, ব্রিজ ও সরকারি স্থাপনা নিজের নামে করতে শুরু করেন গাজী। দেশের বাকি অংশে যখন শেখ মুজিবুর রহমানের গুনগান হত তখন রূপগঞ্জ ছিল ব্যাতিক্রম। রূপগঞ্জে সব জায়গায় শুধু গাজীর নাম ছিল।
নির্বাচিত হওয়ার পরপরই জমি দখল ও ভূমিদস্যুতায় মেতে উঠেন গাজী। সাধারণ মানুষের বিঘার পর বিঘা জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাতের আঁধারে ড্রেজার দিয়ে বসত বাড়িসহ জায়গা ভরাট করে ফেলতেন গাজী। যেখানে সেখানে লাগিয়ে দিতেন সাইনবোর্ড। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও তার ভূমিদস্যুতা থেকে নিস্তার পায়নি। দখলকৃত এসকল জমির উপরে বিভিন্ন ফ্যাক্টরি গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপিসহ বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপর গাজী বাহিনীর নির্যাতন ছিল নির্মম ও বর্বরোচিত। বিএনপি নেতাকর্মীদের না পেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যদের উপর হামলা চালিয়ে তাদের মারধরের ঘটনা ঘটিয়েছে গাজীর সন্ত্রাসীরা। গাজী বাহিনীর প্রতাপে রূপগঞ্জে বিরোধীদলীয় কোন নেতাকর্মী দীর্ঘ সতেরো বছর বাড়িতে থাকতে পারেনি। বিএনপি নেতাকর্মীরা গাজীর উৎপাতে ব্যবসা করতে পারেনি রূপগঞ্জে।
গাজীর বাহিনীর চাঁদাবাজিতে জিম্মি ছিল রূপগঞ্জ। প্রতিটি সেক্টর থেকে চাঁদা তুলতেন গাজীর পিএসরা। এই চাঁদার টাকা দিয়েই বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী লালন পালন করতেন গাজী। প্রশাসন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও গাজী একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। রূপগঞ্জের প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে গাজীর পছন্দেই নিয়োগ, বদলি হত। এছাড়াও সরকারি স্কুলসহ প্রায় সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির নেতৃত্বে ছিলেন গাজী পরিবারের সদস্যরা।
দীর্ঘ সতেরো বছরের লুটপাট ও অত্যাচারের পর গাজীর নামে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে রূপগঞ্জের সাধারণ মানুষ। ভবিষ্যতে এমন কোন দানব যেন আর তৈরি না হয় সেই প্রার্থনা তাদের। পাঁচ আগষ্টের পর ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার হন গেলাম দস্তগীর গাজী। তার বিরুদ্ধে ছাত্র হত্যাসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। এসকল মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন একসময়কার দাপুটে এই নেতা। রূপগঞ্জের সাধারণ মানুষেরা বলছেন, গাজীর রাজনীতির ইতি এখানেই।
গণঅভ্যুত্থানের পর পট পরিবর্তনঃ
রাজনীতির বাইরে ব্যাবসায়িক অঙ্গনেও দিপু ভূঁইয়ার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন দিপু ভূঁইয়া। এ ছাড়াও পূর্বাচল ক্লাবের নির্বাহী সভাপতির দায়িত্বে আছেন দিপু।
জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ভূঁইয়া পরিবারের সদস্য দিপু। তিন পুরুষ ধরে এই পরিবারটি নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ব্যাবসায়ে সফলতা অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশের বৃহত্তর পাইকারি কাপড়ের মার্কেট পরিচালনা করছে দিপু ভূঁইয়ার পরিবার।
পাকিস্তানি আমলের আলোচিত ২২ শিল্পপতি পরিবারের মধ্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একটি পরিবার ছিল ভূঁইয়া পরিবার। দিপু ভূঁইয়ার দাদা গোলবক্স ভূঁইয়া পাকিস্তানি আমল থেকেই দেশের অন্যতম শিল্পপতিদের একজন ছিলেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দ্বিতীয় শীর্ষ সফল বাঙালি ব্যবসায়ী। স্বাধীনতার পর দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নানাবিধ কর্মসূচি হাতে নেন তিনি।
দিপুর বাবা প্রয়াত মজিবুর রহমান ভূঁইয়া ছিলেন রূপগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সফল চেয়ারম্যান। ব্যক্তিজীবনে তিনিও সফল শিল্পপতি ও উদ্যোক্তা হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। তার নেতৃত্বে গাউছিয়া গ্রুপ দেশের ব্যাবসায়িক অঙ্গনে ব্যাপক সুনাম অর্জন করে।
পাঁচ আগষ্টের পর থেকেই রূপগঞ্জ চষে বেড়াচ্ছেন দিপু ভূঁইয়া। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কর্তৃক ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারে ৩১ দফা দাবী নিয়ে নিয়মিত কর্মশালা ও আলোচনা সভা করে যাচ্ছেন দিপু ভূঁইয়া। সামনে প্রান্তিক পর্যায়ে এই ৩১ দফা কর্মসূচি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দিপু ভূঁইয়ার। সে অনুযায়ী প্রচার প্রচারণাও শুরু করেছেন তিনি।
রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি মানবিক ও সমাজসেবামূলক নানা কাজ করে যাচ্ছেন দিপু ভূঁইয়া। রমজান জুড়ে দলীয় ও ব্যাক্তিগত উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জজুড়ে দুস্থ ও অসহায়দের পাশে দিপু ভূঁইয়া যেভাবে দাঁড়িয়েছেন তা ছিল প্রশংসনীয়।
ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে পরিচিত, বিজিএমইএ'র সাবেক সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী মনিরুজ্জামান বর্তমানে রূপগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। বিএনপির সর্বশেষ অংশ নেয়া জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছিলেন এ নেতা।
তিনি বলেন, সরকারি দলের নেতাকর্মী ও এমপি মানেই এদেশে আতংক। জামায়াতে ইসলামী দায়িত্ব নিলে মানুষ বুঝতে পারবে এমপি মানে জনগণের সেবক। আমরা মানুষের দুঃখ দুর্দশা শুনবো তাদের জন্য কাজ করবো। এমপি মানে যে আতংক এটা বাংলাদেশে আর থাকবে না।
মাওলানা ইমদাদুল হাসেমীঃ
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যে নানা হিসেব নিকেশ কষতে শুরু করেছেন ভোটাররা। দীর্ঘদিন ভোটা না দেয়ায় আগামী নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ ভোটারদের মাঝে রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। বিশেষ করে তরুণ ভেটারদের যারা এখনও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি তারা ভোট দিতে অনেকটা মুখিয়ে আছেন।
নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের কন্ঠেও এবার পরিবর্তনের বার্তা রয়েছে। রূপগঞ্জের এক মহিলা গার্মেন্টস কর্মী জানান, আগে ভোট মানে ছিল ভয়। নির্বাচনকে ঘিরে সংঘাত সৃষ্টি হত। তবে এবার আশা করছি ভোট সুন্দর হবে, সুষ্ঠু হবে। আমরা ভোট দিতে পারবো। উৎসবের আমেজ তৈরী হবে ভোটের পুরো সময়টায়।
স্থানীয় এক মাদ্রাসা শিক্ষক জানান, যে নিজের জন্য নয় মানুষের জন্য, উপজেলার জন্য রাজনীতি করে, জনগণের জন্য কাজ করে। এমন যাকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি, যিনি সবসময় আমাদের পাশে থাকেন এমন নেতাকেই আমরা এবার নির্বাচিত করবো।