ফাইল ছবি
কেন্দ্র ঘোষিত সাংগঠনিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে অপপ্রচার, শিষ্টাচারবহির্ভূত রাজনীতি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আগামীকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) নারায়ণগঞ্জে জেলা ও মহানগর যুবদলের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
সমাবেশকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা যুবদল। তবে গত কয়েক মাসের সংঘর্ষ, হামলা, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং একের পর এক নেতাকর্মীর বহিষ্কারের ঘটনাকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই এই কর্মসূচি পালিত হতে যাচ্ছে।
সমাবেশ সফল করতে গত রোববার (২৮ জুন) সকালে জেলা যুবদলের আহ্বায়ক সাদেকুর রহমান সাদেকের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনির সঞ্চালনায় জেলার বিভিন্ন ইউনিটের দায়িত্বশীল নেতাদের নিয়ে ধারাবাহিক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচি সফল করতে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর যুবদলের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং দলীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সংগঠনটিকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে আজকের সমাবেশকে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
গত ৯ এপ্রিল ফতুল্লার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে যুবদলের দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত দুইজন গুলিবিদ্ধ হন। আহতদের মধ্যে ছিলেন মাদ্রাসাছাত্র মোহাম্মদ ইমরান ও রাকিবুল ইসলাম।
ফতুল্লার ঝুট ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরেই কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলে আসছে। সেই দ্বন্দ্বের জেরেই সংঘর্ষ, হামলা ও গোলাগুলির মতো ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে এনায়েতনগর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মনির হোসেন, সাধারণ সম্পাদক খায়রুল আলম জসিম এবং লিয়ন মাহমুদ আকাশকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
এরপর ২১ এপ্রিল সদর উপজেলার বক্তাবলী খেয়াঘাটে ইজারার টেন্ডার জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে যুবদল ও এনসিপি-সমর্থিত দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ছয়জন আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকে।
৪ মে রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকায় পুলিশের কাছ থেকে এক ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে যুবদল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। পুলিশ জানায়, রূপগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর একদল লোক পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। শামীম মিয়ার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। ঘটনার পরদিনই কেন্দ্রীয় যুবদল তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে।
৪ জুন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অকিল উদ্দিন ভূঁইয়ার ওপর হামলার ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ ওঠে, জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনির সঙ্গে বাকবিতণ্ডার জেরে তার অনুসারীরা ওই হামলা চালায়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে যুবদলের চার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়।
এর মাত্র দুই দিন পর, ৬ জুন সিদ্ধিরগঞ্জে চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোফাজ্জল হোসেন আনোয়ারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ধারালো অস্ত্র ও লোহার শাবল দিয়ে ওই শিক্ষার্থীকে গুরুতর জখম করা হয়।
ঘটনার পর ৮ জুন কেন্দ্রীয় যুবদল পেশিশক্তি প্রদর্শন ও দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মোফাজ্জল হোসেন আনোয়ারকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করে।
কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম সোহেলের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়নের নির্দেশনায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
সর্বশেষ চাঁদাবাজিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে এবং জেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খায়রুল ইসলাম সজীবকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একইসঙ্গে তার প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল করা হয়।
এর আগে ২০ জুন রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে তাকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তাকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পরবর্তীতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
একের পর এক বিতর্ক, সংঘর্ষ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ যুবদলের সাংগঠনিক ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় সমাবেশ শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিই নয়, বরং সংগঠনের ঐক্য, নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রদর্শনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

