বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

|

আষাঢ় ২৯ ১৪৩৩

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

জুলাই স্মরণ : নারায়ণগঞ্জে প্রথম মিছিলে আন্দোলন শুরু হয় ১৫ জুলাই 

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ১৮:২৩, ১৪ জুলাই ২০২৬

জুলাই স্মরণ : নারায়ণগঞ্জে প্রথম মিছিলে আন্দোলন শুরু হয় ১৫ জুলাই 

ফাইল ছবি

নারায়ণগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে ১৫ জুলাই ২০২৪ দিনটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনার দিন। 

এদিন প্রথম কোটা বিরোধী আন্দোলনের পক্ষে শহরে মিছিল হয়। মশাল মিছিলটি ছিল সাহসিকতায় পূর্ণ। 

শেখ হাসিনার দেওয়া 'রাজাকার' মন্তব্য ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। একই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদেই শহরে বের হয়েছিল মশাল মিছিলটি। দিনের শেষভাগে সেই মিছিল যেন ঘোষণা দেয়, নারায়ণগঞ্জের আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না, এটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর গণপ্রতিরোধের পথে এগোচ্ছে। 

দিনটি ছিল সোমবার। সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে জড়ো হতে শুরু করেন ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী। আগের দিনের মতোই তারা প্ল্যাকার্ড লিখে কর্মসূচির প্রস্তুতি নেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনার থেকে মিছিল বের করেন। মিছিলটি বঙ্গবন্ধু সড়ক ও সিরাজউদ্দৌলা সড়ক প্রদক্ষিণ করে চাষাঢ়ার স্বাধীনতা চত্বরে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি ফারহানা মানিক মুনা। 

সমাবেশে শিক্ষার্থীরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্দোলনকারীদের নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। সেখান থেকেই রাজপথে ধ্বনিত হতে থাকে, ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার’ এবং ‘কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ স্লোগান। বক্তারা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে শিক্ষার্থীদের অবমাননাকর বলে উল্লেখ করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। আন্দোলনের শুরু থেকে এটিই ছিল নারায়ণগঞ্জে সবচেয়ে তীব্র রাজনৈতিক ভাষার প্রকাশ, যা পরবর্তী আন্দোলনের গতিপথেও বড় প্রভাব ফেলে। 

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলেও আন্দোলনকে ঘিরে একই দিন জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। দুপুর থেকেই শহরের কলেজ রোড, সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া এবং রূপগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের অস্ত্রসহ মহড়া দিতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। এসব খবর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করলেও তারা কর্মসূচি থেকে সরে আসেননি। 

দিনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে সন্ধ্যার পর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জ শহরে বের হয় মশাল মিছিল। শহীদ মিনার থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি বঙ্গবন্ধু সড়ক প্রদক্ষিণ করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হয়। মিছিলে রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের পাশাপাশি সরকারি তোলারাম কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সংস্কৃতিকর্মীরাও অংশ নেন। 

সেদিনের স্মৃতিচারণা করে জেলা ছাত্রফ্রন্টের নেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের দলীয় কার্যালয়ে আগে থেকেই মশাল বানানো ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার খবর পাওয়ার পর অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাৎক্ষণিকভাবে মশাল মিছিলের সিদ্ধান্ত নিই। এই মিছিলের পর থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেদিন শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সতর্ক অবস্থান নেয়। যদিও বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি, তবে আন্দোলন ও পাল্টা শক্তি প্রদর্শনের কারণে পুরো শহরে ছিল চাপা উত্তেজনা। প্রশাসনের নজরদারিও ছিল বাড়তি। 

আন্দোলনকারীদের মতে, ১৫ জুলাই ছিল নারায়ণগঞ্জের জুলাই আন্দোলনের মোড় ঘোরানোর দিন। এদিন আন্দোলন শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, আন্দোলনকারীদের ভাষা, স্লোগান ও প্রতিবাদের ধরনেও আসে স্পষ্ট পরিবর্তন। একই সঙ্গে ছাত্রলীগের মহড়ার অভিযোগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হামলার প্রতিবাদে মশাল মিছিল আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করে। 

পরে দেখা যায়, ১৫ জুলাইয়ের এই প্রতিবাদই ছিল নারায়ণগঞ্জের ধারাবাহিক উত্তাল দিনের সূচনা। পরদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। আবু সাঈদের নিহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। আর নারায়ণগঞ্জও ধীরে ধীরে পরিণত হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদে।