মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

|

আশ্বিন ২৭ ১৪৩৩

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

সবাই যখন ঘুমে ইউএনও তখনও জনসেবায়

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ১২:২৪, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

সবাই যখন ঘুমে ইউএনও তখনও জনসেবায়

ফাইল ছবি

রাত তখন সাড়ে ১২টা। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এক নারী পড়ে আছেন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। শরীরের হাত-পা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ। পরনের কাপড়চোপড়ও ছিঁড়ে গেছে। পাশে নেই কোনো স্বজন, নেই তাঁর পরিচয় জানার মতো কেউ। যাঁরা তাঁকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে এনেছেন, তাঁরাও জানালেন, তাঁরা ওই নারীর আত্মীয় নন। এমন অসহায় পরিস্থিতিতে খবর পেয়ে ঘরে বসে থাকেননি আড়াইহাজারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুর রহমান। গভীর রাতে ছুটে যান হাসপাতালে। প্রথমে ওই নারীর জন্য সালোয়ার-কামিজ কেনার ব্যবস্থা করেন। এরপর নিজের খরচে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে এবং সঙ্গে একজন আনসার সদস্য দিয়ে তাঁকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে।
রাতের নিস্তব্ধতায় যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমে, তখন অচেনা এক নারীর পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ যেন দায়িত্বের সীমানা ছাড়িয়ে মানবিকতার এক গল্প হয়ে উঠল। পরিচয় নেই, আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই, পাশে থাকার মতো স্বজনও নেই; তবু একজন বিপন্ন মানুষের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেননি ইউএনও।
ঘটনাটি সোমবার (১২ অক্টাবর) রাত ১১টার দিকে গোপালদী পৌরসভার কলগাছিয়া এলাকার। একটি অজ্ঞাত গাড়ি ওই নারীকে চাপা দিয়ে চলে যায়। আনুমানিক ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী ওই নারী দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। তাঁর হাত-পা ভেঙে যায় এবং পরনের কাপড়চোপড় ছিঁড়ে যায়।
পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক গোলাম সারোয়ার আহত নারীর অবস্থা গুরুতর দেখে দ্রুত তাঁকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন।
কিন্তু উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার ব্যবস্থা করবে কে? আহত নারীকে হাসপাতালে নিয়ে আসা লোকজন জানান, তাঁরা তাঁকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে এনেছেন। তাঁরা ওই নারীর আত্মীয়স্বজন নন। ফলে পরবর্তী চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ তখন সামনে ছিলেন না।
এমন পরিস্থিতিতে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ওই ব্যক্তিরা ইউএনও মো. আসাদুর রহমানের বাসায় গিয়ে ঘটনাটি জানান। খবর শুনে তিনি আর দেরি করেননি। সরাসরি চলে যান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে আহত নারীর অবস্থা দেখে প্রথমে তাঁর জন্য সালোয়ার-কামিজ কেনার ব্যবস্থা করেন। এরপর দ্রুত ঢাকায় নেওয়ার জন্য নিজের খরচে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন। চিকিৎসার পথে সহায়তার জন্য সঙ্গে দেন একজন আনসার সদস্য।
একজন অজ্ঞাতপরিচয় মানুষের জন্য গভীর রাতে এমন উদ্যোগ শুধু দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের ঘটনা নয়; এটি বিপদের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও দৃষ্টান্ত। যাঁর পরিচয় জানা নেই, যাঁর সঙ্গে কোনো আত্মীয়তার বন্ধন নেই, তাঁর প্রয়োজনকেই গুরুত্ব দিয়েছেন ইউএনও।
প্রশাসনিক দায়িত্বের পরিচয় পদবি দিয়ে। কিন্তু সেই দায়িত্বের মানবিক রূপ প্রকাশ পায় মানুষের বিপদের সময়ে। কলগাছিয়ার সেই রাতের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, জনসেবা কেবল কার্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয় গভীর রাতেও, যখন চারপাশের মানুষ ঘুমিয়ে থাকেন।
রাত যখন সবাই ঘুমায়, তখনো কোথাও কেউ বিপন্ন থাকেন। তাঁর পাশে কেউ এগিয়ে এলে অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলে ওঠে মানবতার আলো। আড়াইহাজারের ইউএনও মো. আসাদুর রহমানের গভীর রাতের এই উদ্যোগ সেই মানবিকতারই একটি গল্প।