ফাইল ছবি
নারায়ণগঞ্জে প্রায়ই প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ক্যাডাররা। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলায় লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা ৭৩৭টি। তবে অপরাধীদের হাতে শোভা পাচ্ছে বিদেশি পিস্তল থেকে শুরু করে সাব-মেশিনগানের মতো ভয়ংকর অস্ত্র। সীমান্ত থেকে সড়কপথে কিংবা জলপথের গোপন রুট ববহার করে এসব অস্ত্র ঢুকছে জেলায়।
আধিপত্য বিস্তার ও ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শিল্পনগরীতে প্রায়ই গভীর রাতে গুলির শব্দ শোনা যায়। এখানকার কিছু চিহ্নিত অপরাধী সরাসরি অস্ত্র কেনে না। বড় কোনো অপারেশন বা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য তারা পেশাদার কারবারিদের কাছ থেকে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায় রাতের জন্য অস্ত্র ভাড়া নেয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে রূপগঞ্জ, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়েছে।
এই গ্যাংগুলোর লিডারদের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। এদের কাছে অস্ত্র কেবল অপরাধের মাধ্যম নয়, বরং এক ধরনের দাপট দেখানোর হাতিয়ার।
গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলে, রূপগঞ্জের বালু নদ ও মেঘনা নদীবেষ্টিত এলাকাগুলো অবৈধ অস্ত্রের বড় ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে আসা অস্ত্রের বড় চালান অনেক সময় ট্রলারে করে জলপথে এই এলাকায় আনা হয়।
পরে বালুচরে, লেকে কিংবা ইটের ভাটায় পুঁতে রাখা হয়। বিশেষ কোনো অস্থিরতা বা নির্বাচনের সময় রিজার্ভ থেকে অস্ত্রগুলো বের করা হয়।
গোয়েন্দা সূত্রে আরো জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে তৈরি করা ওয়ান গ্যুটার গান বা পাইপগানগুলো কুমিল্লা ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে আসে। মেঘনা রুটের কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্র মেঘনা নদী হয়ে আড়াইহাজার বা সোনারগাঁও দিয়ে নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করে। বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী রুটের অস্ত্র মুন্সীগঞ্জ হয়ে সদর ও ফতুল্লা এলাকায় পৌঁছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে অনেক সময় বালুবাহী ট্রলার বা পণ্যবাহী কার্গোতে মাছের বাক্স বা আসবাবের আড়ালে অস্ত্র পরিবহন করা হয়। এ ছাড়া সড়কপথ ব্যবহার করেও কিছু অস্ত্র আনা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অস্ত্রের বড় ট্রানজিট পয়েন্ট রূপগঞ্জ। ঢাকা-সিলেট, এশিয়ান হাইওয়ে ও বালু-শীতলক্ষ্যা সংযোগস্থলে থাকায় অবস্থানগত সুবিধা পাওয়া যায়। রূপগঞ্জের বেশ কয়েকটি লেদ মেশিন কারখানায় পাইপগান তৈরি করা হয় বলে জানা গেছে।
সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল ও সাইনবোর্ড মোড়—এই দুটি পয়েন্টে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা সীমান্ত থেকে আসা দূরপাল্লার বাস বা ট্রাকে করে ছোট ছোট চালানে অস্ত্র ঢোকে। কাঁচপুর সেতুর নিচের এলাকা এবং নদীঘাটগুলো ব্যবহার করে রাতের অন্ধকারে অস্ত্রের হাতবদল হয়।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে ছয় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকই দেশি পাইপগান। এ ছাড়া রয়েছে বিদেশি পিস্তল ও শটগান।
নারায়ণগঞ্জ আদালত সূত্রে জানা গেছে, অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তারকৃতদের প্রায় ৭০ শতাংশ জামিনে বেরিয়ে আসে। প্রমাণের অভাব ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি এর প্রধান কারণ।
নারায়ণগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল বাশার রুবেল বলেন, ‘অস্ত্র মামলায় সাক্ষী পাওয়া যায় না সহজে। সন্ত্রাসীদের ভয়ে অনেকে সাক্ষ্য দিতে আসে না। ফলে মামলাগুলো ঝুলে থাকে নতুবা খারিজ হয়ে যায়।’
নারায়ণগঞ্জে প্রতি মাসে গড়ে আট থেকে ১০ জন করে গুলিবিদ্ধ হওয়ার তথ্য মিলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের আলোচিত হত্যাকাণ্ড শিল্পপতি রাসেল ভূঁইয়া, তারেক বিন জামাল, খালেদ বিন জামাল, ছাত্রদল নেতা শফিকুল ইসলাম, হাজি বেলায়াতসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ার কারণে ক্রমেই অবৈধ অস্ত্রের মজুদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২ জুন পূর্বাচল এলাকার একটি খাল থেকে দুটি রকেট লঞ্চার ও ৬২টি এসএমজি, ৪৯টি রকেট লঞ্চার প্রজেক্টর, পাঁচটি ৭.৬২ পিস্তলের ম্যাগাজিন, ৪৯টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ৪৯টি ডেটোনেটর, এসএমজির ৬০টি ম্যাগাজিনসহ বিপুল পরিমাণ টাইমফিউজ, ইগনাইটার ও এক হাজার ৫২৭টি গুলি উদ্ধার করা হয়। এরপর শীতলক্ষ্যা নদীতে অভিযান চালিয়ে একটি খাল থেকে আরো পাঁচটি এসএমজি পাওয়া যায়। এই অস্ত্রের রহস্য আজ অবধি উন্মোচিত হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থানা ও পুলিশ লাইন থেকে ১৫১টি অস্ত্র ও ৯ হাজার গুলি লুট হয়েছে। এর মধ্যে ১১০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও বাকিগুলোর কোনো খোঁজ মেলেনি।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন, ‘আমাদের অভিযান প্রতিদিনই চলছে। গতকালও সোনারগাঁওয়ে পিরোজপুরের একটা গ্রামে বড় অভিযান চালানো হয়েছে। নির্বাচনের পরও এ অভিযান চলবে।’
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযান প্রতিনিয়ত চলছে।’

