ফাইল ছবি
চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কায় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে লক করা ২৫০টি পণ্যচালানের ৩৭৬টি কন্টেইনারের অবস্থান নিয়ে কাস্টমস ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে।
কাস্টমসের দাবি, একাধিকবার চিঠি দেওয়ার পরও কন্টেইনারগুলোর অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা ইতোমধ্যে কন্টেইনারগুলোর অবস্থান ও ডেলিভারির তথ্য কাস্টমসকে জানিয়েছে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুনে নারায়ণগঞ্জের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাইনুল হাসান এন্টারপ্রাইজ ইন্দোনেশিয়া থেকে পাঁচ কন্টেইনার তুলা আমদানি করে। ওই বছরের ২৬ জুন পণ্য খালাসের জন্য চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রূপালি ট্রেডার্স লিমিটেড।
এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জের আরেক আমদানিকারক আহমেদ এন্টারপ্রাইজ চীন থেকে চশমার ফ্রেম ও মাউন্টিং ঘোষণা দিয়ে একটি কন্টেইনার পণ্য আমদানি করে। ২৮ মে চালানটি খালাসের জন্য বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বনি-এম ট্রেডার্স।
কাস্টমসের সন্দেহ ছিল, দুটি চালানেই ঘোষণা-বহির্ভূত পণ্য থাকতে পারে। এ কারণে চালানগুলো অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে লক করা হয় এবং কায়িক পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে পরীক্ষার সময় সংশ্লিষ্ট কন্টেইনারগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি বলে কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান।
কাস্টমসের দাবি, শুধু এই ছয়টি কন্টেইনার নয়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে লক করা মোট ২৫০টি পণ্যচালানের ৩৭৬টি কন্টেইনারের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে গত ৯ মাসে একাধিকবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এবং এর আগে ২৬ জানুয়ারি চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে কাস্টমস জানায়, ২০২১ সালের ৮৩টি, ২০২২ সালের ৬১টি, ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের ৬৬টি বিল অব এন্ট্রি এখনও অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লক অবস্থায় রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে এসব চালানের কন্টেইনারের বর্তমান অবস্থান জানাতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে পুনরায় অনুরোধ করা হয়। কাস্টমসের দাবি, একাধিকবার অনুরোধের পরও কন্টেইনারগুলোর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন জানান, কাস্টমস ২৫০টি পণ্যচালানের কথা বললেও প্রকৃত সংখ্যা ২৪৭টি। এর মধ্যে ১৬৪টি এফসিএল চালানে মোট ২৯৩টি কন্টেইনার রয়েছে। এসবের মধ্যে ৮৮টি কাস্টমস আউটপাসের মাধ্যমে ডেলিভারি হয়েছে, ৭০টি আইজিএম ঘোষণা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রাইভেট ডিপোতে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং ১৩১টি বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে রয়েছে। এ ছাড়া চারটি কন্টেইনার নম্বরের ডিজিট বা প্রিফিক্স সঠিক নয়।
তিনি আরও বলেন, বাকি ৮৩টি এলসিএল চালানের মধ্যে আটটির পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে, ৩৫টি কন্টেইনার বন্দরের বিভিন্ন সিএফএস বা শেডে রয়েছে এবং অবশিষ্ট ৪০টি চালানের ক্ষেত্রে কাস্টমসের দেওয়া বি/এল নম্বরের সঙ্গে তথ্যের অসঙ্গতি রয়েছে। এ সব তথ্য ইতোমধ্যে লিখিতভাবে কাস্টমসকে জানানো হয়েছে।
তবে কাস্টম হাউসের উপ-কমিশনার (এআইআর) মো. তারেক মাহমুদ বলেন, “বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা এ ধরনের কোনো চিঠি পাননি”।
তিনি বলেন, “কন্টেইনারগুলোর অবস্থান জানতে আমরা একাধিকবার চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাইনি। সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসে চিঠি পাঠানো হয়েছে”।
এদিকে কন্টেইনারগুলোর অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার ঘটনায় বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, জাহাজ থেকে কন্টেইনার খালাসের পর ডেলিভারি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই বন্দরের পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকার কথা। ফলে কন্টেইনারের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারা উদ্বেগের বিষয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম (বিলু) বলেন, “এত সংখ্যক কন্টেইনারের অবস্থান না পাওয়ার বিষয়টি বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ, একটি কন্টেইনার বন্দর থেকে বের হওয়ার আগে শুল্কায়ন, ইয়ার্ড থেকে উত্তোলন এবং গেটে স্ক্যানিংসহ একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এসব প্রক্রিয়ার মধ্যে কাস্টমস ও বন্দরের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন। ফলে অবৈধভাবে কন্টেইনার বের হয়ে গেলে তা গুরুতর উদ্বেগের বিষয়”।
তিনি আরও বলেন, “কন্টেইনারগুলো ‘গায়েব’ হয়েছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বন্দর কর্তৃপক্ষের উচিত সরেজমিনে পুনরায় অনুসন্ধান করা। একই সঙ্গে কাস্টমসেরও যাচাই করা প্রয়োজন, কন্টেইনারগুলো খালাসের পর লক করা হয়েছিল কি না”।
বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, “অতীতেও বন্দর থেকে কন্টেইনার চুরির ঘটনা ঘটেছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে; কিছু তাৎক্ষণিকভাবে এবং কিছু বন্দর এলাকা ছাড়ার পর উদ্ধার করা হয়েছে”।
তিনি বলেন, “কন্টেইনার চুরি ঠেকাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এআই-নির্ভর ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং রিয়েল-টাইম কন্টেইনার ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কন্টেইনার নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে সরানো হলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাওয়া যাবে”।

