ফাইল ছবি
শীতলক্ষ্যা নদীর বুকে নোঙর করা একটি জাহাজ। দূর থেকে সাধারণ নৌযান মনে হলেও কাছে গেলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। ভেতরে রয়েছে চিকিৎসকের কক্ষ, প্যাথলজি ল্যাব, এক্স-রে কক্ষ ও অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন চোখের চিকিৎসা নিতে, কেউ দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে, আবার কেউ এসেছেন স্বজনকে নিয়ে।
এটি ‘ইমপ্যাক্ট জীবন তরী’ নামের ভাসমান হাসপাতাল। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চন ঘাটে নোঙর করা এই হাসপাতালে মাত্র ৫০ টাকার টিকিটে পাওয়া যাচ্ছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের সুযোগ। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে স্থানীয় গ্রামীণ ধাত্রীদের দেওয়া হচ্ছে সাত দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ।
নদীতীরবর্তী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। যাঁদের জন্য শহরের হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া মানে বাড়তি যাতায়াত খরচ, সময়ের অপচয় ও আর্থিক চাপ, তাঁদের কাছে জীবন তরী হয়ে উঠেছে চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা।
জীবন তরীতে চক্ষু, নাক-কান-গলা, অর্থোপেডিকসসহ বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। রয়েছে প্যাথলজি পরীক্ষা, এক্স-রে ও অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা। জন্মগত ঠোঁটকাটা ও তালুকাটাসহ নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারও করা হয় এখানে।
হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা এক ব্যক্তি জানান, তাঁর মায়ের চোখের সমস্যা দেখা দিলে জীবন তরীতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অস্ত্রোপচার করান। বর্তমানে মায়ের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তাই পরবর্তী চিকিৎসা পরামর্শ নিতে তাঁকে আবারও নিয়ে এসেছেন। স্বল্প খরচে চিকিৎসার সুযোগ পেয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট।
তবে ৫০ টাকার টিকিট মূলত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য। সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ কিংবা অস্ত্রোপচারের খরচ এর অন্তর্ভুক্ত নয়। সেবার ধরন অনুযায়ী এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।
ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের উদ্যোগে ১৯৯৯ সালের ১০ এপ্রিল পদ্মার মাওয়া ঘাট থেকে ভাসমান হাসপাতাল জীবন তরীর যাত্রা শুরু হয়। নদীবেষ্টিত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত জীবন তরীতে আট লাখের বেশি মানুষ চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। এ সময়ে ৫৮ হাজারের বেশি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ এই যাত্রায় চক্ষু চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি শ্রবণসমস্যা, চলাচলের অক্ষমতা এবং জন্মগত বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছে।
ভাসমান হাসপাতালটির বিশেষত্ব হলো, এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নয়। নদীপথে বিভিন্ন জনপদে গিয়ে মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয়। গত দুই মাস ধরে রূপগঞ্জের কাঞ্চন ঘাটে অবস্থান করছে হাসপাতালটি। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে এর কার্যক্রম।
চিকিৎসার পাশাপাশি নিরাপদ মাতৃত্বের পাঠ
জীবন তরীর মানবিক উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রামীণ ধাত্রীদের প্রশিক্ষণ। নিরাপদ মাতৃত্ব ও নবজাতকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে সাত দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
গ্রামীণ জনপদে প্রসবের সময় স্থানীয় ধাত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রে অন্তঃসত্ত্বা নারীর পরিচর্যা থেকে প্রসবকালীন সহায়তা—সবকিছুর জন্য পরিবারের সদস্যরা তাঁদের ওপর নির্ভর করেন। তবে শুধু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা দিয়ে মা ও নবজাতকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, বিপদের লক্ষণ শনাক্ত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জ্ঞান।
প্রশিক্ষণে গর্ভাবস্থায় বিপদের লক্ষণ চেনা, প্রসবের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নবজাতকের প্রাথমিক পরিচর্যা এবং মা ও শিশুর শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত উপযুক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর বিষয়ে ধারণা দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে প্রসবকালীন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, গর্ভাবস্থায় খিঁচুনি কিংবা নবজাতকের শ্বাসকষ্টের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধাত্রীরা যেন এসব ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হন এবং প্রয়োজনের সময় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা নিতে পারেন, সেটিই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের ধাত্রী প্রশিক্ষক মোসাম্মৎ সোনিয়া সুলতানা জানান, সাত দিনের প্রশিক্ষণে স্থানীয় ধাত্রীদের নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রসবকালীন পরিচ্ছন্নতা, নবজাতকের প্রাথমিক পরিচর্যা এবং মা ও শিশুর ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি শনাক্ত করার বিষয়ে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষিত ধাত্রীরা চিকিৎসকের বিকল্প নন। তাঁদের দায়িত্ব হলো প্রাথমিক পরিচর্যায় সহায়তা করা এবং কোনো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত মা ও শিশুকে উপযুক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো।
ইমপ্যাক্ট জীবন তরী ভাসমান হাসপাতালের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং নিরাপদ মাতৃত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই তাঁদের কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য।
সাত দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ধাত্রীরা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেলে তাঁদের অর্জিত জ্ঞান স্থানীয় পরিবারগুলোর কাজে আসতে পারে। গর্ভবতী নারীর বিপদের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করা, নবজাতকের পরিচর্যা নিয়ে সঠিক ধারণা দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় হাসপাতালে যাওয়ার গুরুত্ব বোঝানোর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।
তবে প্রশিক্ষণের সুফল দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীদের সঙ্গে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের যোগাযোগ, জরুরি রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থা এবং দক্ষ চিকিৎসকের সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব সমন্বয় কার্যকর হলে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে।
শীতলক্ষ্যার বুকে নোঙর করা জীবন তরী তাই শুধু একটি ভাসমান হাসপাতাল নয়, চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছানোর এক মানবিক উদ্যোগ। কারও কাছে এটি স্বল্প খরচে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার ঠিকানা, কারও কাছে চোখের অস্ত্রোপচারের পর নতুন করে আশার আলো দেখার জায়গা। আবার কোনো প্রশিক্ষণার্থীর কাছে এটি নিজের এলাকায় অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নবজাতকের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখার নতুন সুযোগ।
একটি ভাসমান হাসপাতাল সব চিকিৎসাসংকটের সমাধান দিতে না পারলেও নদীবেষ্টিত ও সুবিধাবঞ্চিত জনপদে চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নদীর স্রোতের মতো মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক নতুন নতুন জনপদে। দূরত্ব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে যেন কাউকে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হতে না হয়। শীতলক্ষ্যার বুকে ভাসমান জীবন তরীর মানবিক উদ্যোগের সার্থকতা সেখানেই।

