ফাইল ছবি
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ নৌপথে চলাচলকারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একের পর এক ভয়াবহ লঞ্চ দুর্ঘটনার পরও এ নৌপথে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়নি। বরং জরাজীর্ণ নৌযান, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অদক্ষ চালক এবং নদীর মাঝপথে কার্গো জাহাজের অনিয়ন্ত্রিত নোঙরকে কেন্দ্র করে নতুন করে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত কয়েক বছরে এই নৌপথেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ‘সাবিত আল হাসান’ লঞ্চ ডুবে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়। এর এক বছরের মাথায় ২০২২ সালে ‘এমএল আফসারউদ্দিন’ ডুবে আরও ১০ জন প্রাণ হারান। এসব ঘটনার পর নিরাপদ নৌযান চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি।
সরেজমিনে মুন্সীগঞ্জ লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নির্দিষ্ট বিরতিতে লঞ্চ নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ থেকেও যাত্রী নিয়ে মুন্সীগঞ্জে ফিরছে নৌযানগুলো। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ এই রুট ব্যবহার করলেও অধিকাংশ লঞ্চই বহু বছরের পুরোনো। নিয়মিত সংস্কার ও জোড়াতালি দিয়ে এগুলো সচল রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
এদিকে ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীর বিভিন্ন অংশে শিল্পকারখানার কার্গো জাহাজ দীর্ঘ সময় নোঙর করে রাখায় নৌপথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নদীর প্রবেশমুখে বড় জাহাজের অবস্থানের কারণে লঞ্চ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চালকদের অনেক সময় সংকীর্ণ পথ দিয়ে যাত্রীবাহী লঞ্চ চালাতে হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নিয়মিত এ রুটে চলাচলকারী ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, সড়কপথে যাতায়াত সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বাধ্য হয়েই লঞ্চ ব্যবহার করেন। তবে প্রতিটি যাত্রাতেই দুর্ঘটনার ভয় কাজ করে। তার অভিযোগ, অনেক লঞ্চে অদক্ষ চালক দায়িত্ব পালন করছেন, যা যাত্রীদের জন্য বড় ঝুঁকি।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আনোয়ার মিয়া জানান, প্রতিদিন অফিসে যাতায়াতের জন্য লঞ্চে উঠতে হয়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত দুশ্চিন্তা কাটে না। অনেক সময় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহন করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কলেজ শিক্ষার্থী জীবন আহমেদ বলেন, বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীসহ শত শত মানুষ প্রতিদিন এই রুটে যাতায়াত করে। তাই বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার পর কয়েকটি লঞ্চকে নতুন করে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে যাত্রী সংকট ও অন্যান্য কারণে সীমিতসংখ্যক লঞ্চ চলাচল করলেও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
মুন্সীগঞ্জ লঞ্চঘাটের ইজারাদার দিল মোহাম্মদ কোম্পানি বলেন, বড় কয়েকটি লঞ্চ ইতোমধ্যে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। নদীতে কার্গো জাহাজের সংখ্যা বাড়ায় চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে, যা নৌযান পরিচালনাকে কঠিন করে তুলছে।
অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার নারায়ণগঞ্জ জোনের সভাপতি মো. বদিউজ্জামান বাদল বলেন, নতুন লঞ্চ কেনার মতো আর্থিক সক্ষমতা অনেক মালিকের নেই। তাই পুরোনো নৌযান সংস্কার করেই চলাচল অব্যাহত রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জানিয়েছে, নদীতে নিয়মবহির্ভূতভাবে কার্গো জাহাজ নোঙর করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নৌপথ সচল ও নিরাপদ রাখতে জাহাজগুলোকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে নোঙর করার নির্দেশ দেওয়া হবে।
মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সৈয়দা নূরমহল আশরাফী বলেন, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ কিংবা অনিয়মের অভিযোগ পেলে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় নিরাপদ নৌযান নিশ্চিত করতে বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে সমন্বয় করে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো লঞ্চের পরিবর্তে নিরাপদ নৌযান চালু, দক্ষ চালক নিয়োগ, অতিরিক্ত যাত্রী বহন বন্ধ এবং নদীতে কার্গো জাহাজের নিয়ন্ত্রিত নোঙর নিশ্চিত করা না গেলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ নৌপথে আবারও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

