
ফাইল ছবি
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় প্রায় ১৪ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার টাকার প্রতারণার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন রাহাবার এগ্রো নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক ইসমাইল হোসেন রতন (৩১)। বাদীর অভিযোগ, এক সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিশ্বাস অর্জন করে বিপুল পরিমাণ মালামাল আত্মসাৎ করেছে এবং পরে তাকে ভয়ভীতি ও হত্যার হুমকিও দিয়েছে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাদী ইসমাইল হোসেন রতন নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার চামটা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বর্তমানে ঢাকার আদাবরে বসবাস করেন এবং নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়নের হাজীগঞ্জ ওয়াবদারপুল এলাকায় রাহাবার এগ্রো নামের একটি উৎপাদন, মজুদ ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ব্যবসায়িক পণ্য যেমন ভুট্টা, ডাল, সরিষা, চিনি, গম, সয়াবিন ইত্যাদি আমদানি ও সরবরাহ করে আসছিলেন তিনি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারক চক্র তার কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার পণ্য নিয়েছে কিন্তু সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করেছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রামের এক ব্যক্তি অহিদ মামুন ভুট্টা ক্রয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হন। তিনি জানান, মালামাল খুলনার জনৈক জয়দেব মন্ডলের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। প্রাথমিকভাবে মাল পাঠানো হলে আসামিরা বিভিন্ন কৌশলে টাকা লেনদেনে গড়িমসি করে। পরবর্তীতে তারা নিজেদের ‘মেসার্স ভাই ভাই স্টোর এস এম এজ কর্পোরেশন, চুপনগর বাজার, ডুমুরিয়া, খুলনা’-এর মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভিজিটিং কার্ড হোয়াটসঅ্যাপে পাঠায়। বাদী এগুলো সত্যি মনে করে প্রায় ১৫ টন ভুট্টা পাঠান, যার বাজারমূল্য ছিল ৪ লাখ ১১ হাজার টাকা।
প্রথম দফায় আংশিক অর্থপ্রদানের মাধ্যমে আসামিরা বাদীর বিশ্বাস অর্জন করে। ধীরে ধীরে বিভিন্ন সময়ে বিশাল পরিমাণ ডাল, ভুট্টা পাউডার, সরিষা, গমসহ নানা পণ্য সরবরাহ নিতে থাকে। একেকটি চালান ছিল কয়েক কোটি টাকার। প্রথমদিকে আংশিক টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠালেও পরবর্তীতে হিসাব নিকাশ শেষে বাদীর কাছে প্রায় ১৪ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার ৩০২ টাকা বকেয়া থেকে যায়।
বাদীর অভিযোগ, এভাবে আসামিরা সুপরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে তার কাছ থেকে পণ্য নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এমনকি শেষদিকে আসামিদের দেয়া চেকও ভুয়া প্রমাণিত হয়। পরে বাদী সত্যিকারের জয়দেব বাবুর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তার নামে ব্যবহৃত জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভিজিটিং কার্ড জাল এবং তিনি এসব লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত নন। এতে স্পষ্ট হয়, মহাদেব চন্দ্র সাধু ও তার সহযোগীরা অন্যের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিল।
এজাহারে প্রধান আসামি করা হয়েছে মহাদেব চন্দ্র সাধু (৪০), পিতা- সোনাতন চন্দ্র সাধু, মাতা- স্বপ্না রানী সাধু, গ্রাম- মাগুরা গোপিনাথপুর, সাতক্ষীরা। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সোমাতন চন্দ্র সাধু (৬৫), কাকুলি রানী সাধু (৩৬), শুভ সাহা (২০), মন্দিরা রানী সাধু (১৯), জয়দেব মন্ডল (৫৩) সহ আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি। এরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন সময় বাদীর কাছ থেকে পণ্য গ্রহণ ও অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
বাদীর দাবি, এই চক্রটি কেবল তার সাথেই প্রতারণা করেনি, দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে এবং অনেক মামলাই বর্তমানে বিচারাধীন। বাদী আরো উল্লেখ করেন, এক পর্যায়ে তিনি পাওনা টাকা চাইতে আসামিদের বাড়িতে গেলে সোমাতন চন্দ্র সাধু প্রকাশ্যে তাকে হত্যার হুমকি দেয়।
এজাহারে প্রতারণার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে বাদী বলেন, ২৩ মার্চ থেকে শুরু করে জুন মাস পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে তার প্রতিষ্ঠান থেকে কানাডিয়ান সরিষা, মশুর ডাল, রাশিয়ান মটর, গম, ছোলা, চিনি, সয়াবিনসহ বিপুল পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে। এর বিপরীতে সামান্য অংক পরিশোধ করলেও মোট ১৪ কোটি ৯০ লাখ টাকার বেশি এখনো বকেয়া রয়েছে। তিনি জানান, প্রতারকরা তার সরলতা ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে জাল জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভিজিটিং কার্ড ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হিসেবে প্রতারণা করেছে।
এজাহারে বাদী সাক্ষী হিসেবে তার প্রতিষ্ঠানের একাউন্টস ম্যানেজার মোঃ সামছুল কবির, অফিস কর্মকর্তা মোঃ কামাল হোসেন, সহকর্মী মোঃ মাসুদ ও প্রাথমিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া অহিদ মামুনের নাম উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ব্যাংক লেনদেনের রিসিট ও ভুয়া ভিজিটিং কার্ডসহ বিভিন্ন প্রমাণ সংযুক্ত করেছেন।
ঘটনার পর বাদী ইসমাইল হোসেন রতন ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-৩১, তাং ২১/০৮/২০২৫, ধারা- ৪০৬/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৫০৬ পেনাল কোডে এজাহারটি রুজু করা হয়। বাদীর দাবি, এই সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের কারণে তিনি কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন এবং আইনের মাধ্যমে তার পাওনা আদায়ের পাশাপাশি আসামিদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফতুল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শরিফুল ইসলাম জানান, মামলার ১নং আসামী অন্য আরেক মামলায় গ্রেফতার ছিলো। রাহবার এগ্রো কোম্পানির মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলার শুনানির জন্য আসামীকে ৩১ আগষ্ট রবিবার আদালতে তোলা হতে পারে।