ফাইল ছবি
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় কয়েকজন শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক আচরণকে কেন্দ্র করে ‘জ্বীন ভর করেছে’ দাবি তুলে তাদের ওপর বেত্রাঘাত, মানসিক নির্যাতন ও অপচিকিৎসা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এটি কোনো অতিপ্রাকৃত বিষয় নয়; মানসিক বা শারীরিক অসুস্থতার কারণেও এমন আচরণ দেখা দিতে পারে।
জানা গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ক্যানেল এলাকায় অবস্থিত তালিমুল কুরআন মহিলা মাদ্রাসায় প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে, যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছাত্রী। গত কয়েকদিন ধরে মাদ্রাসার ১৩ থেকে ১৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দেয়। কেউ চিৎকার করছে, কেউ কান্নাকাটি করছে, আবার কেউ নিজেকে আঘাত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ অবস্থায় কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ওপর ‘জ্বীন তাড়ানোর’ নামে ঝাড়ফুঁক ও বিভিন্ন ধরনের শারীরিক শাস্তি প্রয়োগ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক জানান, প্রথমে তিনজন ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে জটিল আকার ধারণ করে। এরপর অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভয় ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় যেতে অনীহা প্রকাশ করছে। কেউ কেউ আতঙ্কে পড়াশোনাও বন্ধ করে দিয়েছে।
এক অভিভাবক বলেন, বাচ্চারা ভয় পাচ্ছে। তারা একা বাথরুমে যেতে চায় না। জ্বীন-ভূতের গল্প ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। অসুস্থ শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে না নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে বলে শুনেছি।
তালিমুল কুরআন মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা খালেদ হাসান মোরসাদেক দাবি করেন, পার্শ্ববর্তী নূরে মদিনা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল জুবায়ের আহমেদ কবিরাজের মাধ্যমে তাদের প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের ওপর জ্বীন চালান করা হয়েছে।
তবে এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন নূরে মদিনা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল জুবায়ের আহমেদ। তিনি বলেন, জ্বীন চালানের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক। কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে তাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া উচিত। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে।
ঘটনার বিষয়ে গোলাকান্দাইল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন বলেন, জ্বীন তাড়ানোর নামে অপচিকিৎসার অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে প্রশাসনের সহযোগিতা নেওয়া হবে। মানুষকে কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
রূপগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিদ্দিক নূরে আলম বলেন, ঘটনাটি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা সরেজমিনে তদন্ত করবো। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জ্বীন-ভূতের বিষয়গুলো বিজ্ঞানসম্মত নয়, এগুলো নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা উচিত নয়।
অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাদল কুমার শাহা বলেন, মেডিকেল সায়েন্সে জ্বীন ভর করার কোনো ব্যাখ্যা নেই। কোনো শিক্ষার্থীর আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শও প্রয়োজন হতে পারে। যথাযথ চিকিৎসা ছাড়া এ ধরনের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

