শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

|

কার্তিক ১৫ ১৪৩৩

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

না.গঞ্জে হোসিয়ারি মালিকদের শতকোটির ব্যবসার টার্গেট

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ১৩:৩২, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

না.গঞ্জে হোসিয়ারি মালিকদের শতকোটির ব্যবসার টার্গেট

ফাইল ছবি

কোটি টাকার শীতের কাপড় নিয়ে বিক্রির আশায় বসে আছেন নারায়ণগঞ্জের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দেওভোগ কাটা কাপড় মার্কেট, জমু মার্কেট, উকিলপাড়া, নন্দিপাড়া ও নয়ামাটির হোসিয়ারি ব্যবসায়ীরা গরম কাপড় স্টক করছেন। শীতের পোশাকের মৌসুমি ব্যবসা তিন মাসের। এর শুরুটা হয় নভেম্বরে, চলে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত। তবে শীতের ওঠানামায় বেচাকেনা কমবেশি হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলহাজ বদিউজ্জামান বদু বলেন, নারায়ণগঞ্জের এই মৌসুমি ব্যবসা স্থানীয় অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব ফেলে। প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি টাকার গরম কাপড়ের লেনদেন হয় কেবল তিন মাসে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিবহন, শ্রম, গুদাম, ফিনিশিং ও রঙের ব্যবসা। এই সিজনেও ১০০ কোটি টাকার ব্যবসার টার্গেট রয়েছে হোসিয়ারি মালিকদের।
দেওভোগ পোশাক প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মো. কবির হোসেন খান বলেন, আমরা এখন রপ্তানি অনুমোদনের জন্য কাজ করছি। স্থানীয়ভাবে তৈরি সোয়েটার ও ফ্লিস জ্যাকেটের মান খুব ভালো। সরকার করছাড় দিলে আমরা নেপাল-ভুটানেও রপ্তানি শুরু করতে পারব। এই সময়ে নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের জেলাগুলোয় তৈরি করা জ্যাকেট, সোয়েটার, মাফলার, শাল, চাদর ও শিশুদের গরম ধাপে ধাপে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। ঢাকাতেও বড় একটা বাজার রয়েছে। এখন সরগরম নারায়ণগঞ্জের পাইকারি বাজারগুলো। উকিলপাড়া, দেওভোগ, নয়ামাটি ও গিরিধারা এলাকা উৎসবমুখর কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা ছুটে আসছেন ‘গার্মেন্টসের শহর’ খ্যাত নারায়ণগঞ্জে।
নয়ামাটির হোসিয়ারি মালিক মো. রতন বলেন, এই সময়টা আমাদের বছরের সেরা মৌসুম। ঈদের পর থেকে পুরো বছর আমরা অপেক্ষা করি শীতের সিজনের জন্য। এই সময় ভালো বিক্রি হলে সারা বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়। শীতের সিজনে বিভিন্ন কারখানায় বছরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার শ্রমিক মৌসুমি ভিত্তিতে কাজ করেন। বিশেষ করে শীতের আগে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এসব কারখানায় কাজের চাপ বেড়ে যায়।
চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে আসা পাইকার সুজয় বলেন, ঢাকায় বা টঙ্গীতে যে দামে পাই না, নারায়ণগঞ্জে সস্তায় পাই, ডিজাইনও ভালো। শিশুদের ফ্লিস জ্যাকেট, হুডি, উলেন সোয়েটার, টুপি, গ্লাভস—সবকিছুর চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ।
শীতের পোশাকের তালিকায় রয়েছে জ্যাকেট, সোয়েটার, মাফলার, শাল, চাদর—যা ডেনিম, নিট ও উলের কাপড় দিয়ে তৈরি হয়। নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা পোশাক তৈরির পাশাপাশি বাচ্চাদের জন্যও বাহারি সব শীতের পোশাক বাজারে দেখা যায়।
নয়ামাটির একটি কারখানার ভেতরে চলছে নিরবচ্ছিন্ন মেশিনের শব্দ। সারি সারি নিটিং মেশিনে তরুণ শ্রমিকরা কাজ করছেন টুপির বুনন, হাতমোজার সেলাই, সোয়েটারের বোতাম লাগানো সব মিলিয়ে চূড়ান্ত ব্যস্ততা। শ্রমিক মমতাজ বেগম বলেন, এই সময়টা ভালো যায়, বেতনও কিছু বাড়ে, তবে ডিসেম্বরের পর আবার কাজ কমে যায়।
কারখানা মালিক আমজাদ হোসেন বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে রাত-দিন কাজ করছি। এ সময়ই আসল ইনকাম। তবে উৎপাদনব্যয় বেড়েছে। সুতা ও ফ্লিসের দাম বেড়েছে ২০-২৫ শতাংশ। বিক্রেতা বিপ্লব হোসেন বলেন, গত বছর যে সোয়েটারটা ২৫০ টাকায় বানাতাম, এ বছর সেটা ২৯০ টাকায় পড়ছে। কিন্তু পাইকাররা আগের দামে কিনতে চায়। ফলে মার্জিন কমে গেছে। নয়ামাটির ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন বলেন, বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করছি—বাজারটা টিকিয়ে রাখতেই।
উকিলপাড়া মার্কেটের প্রবীণ ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা বলেন, গত কয়েক বছর শীত একেবারে দেরিতে এসেছে। শীত না পড়লে স্টক পড়ে থাকে, লাভ তো দূরের কথা, পুঁজিও ফেরত আসে না।
নারায়ণগঞ্জের গরম কাপড়শিল্পের ইতিহাস সত্তরের দশক থেকে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ছোট লটে ফ্লিস, উল, এক্রিলিক ও সুতা আমদানি করে নিজেদের উৎপাদন চেইন তৈরি করেন। এলাকার দেওভোগ, মুসলিমনগর, পাইকপাড়া, নবাবপুর ও চাষাঢ়া এলাকার প্রায় তিনশর বেশি ছোট ও মাঝারি গরম কাপড় কারখানা আছে। বর্তমানে তিন শতাধিক ছোট-বড় কারখানায় প্রায় ২৫-৩০ হাজার শ্রমিক মৌসুমভিত্তিতে কাজ করেন।
পাইকারি বাজারে এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে শিশুদের পোশাক। কারণ অভিভাবকরা সবার আগে সন্তানদের জন্য শীতের প্রস্তুতি নেন। দ্বিতীয়ত, কিশোর ও তরুণদের হুডি, জ্যাকেট ও সোয়েটার বিক্রি হচ্ছে বেশি। বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, স্কুল খুলবে নভেম্বরের শুরুতে। তাই এখন থেকেই অভিভাবকরা পাইকারদের দিয়ে স্কুলড্রেস ধাঁচের জ্যাকেট নিচ্ছেন।
নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক ফারুক আহমেদ বলেন, শীতের মৌসুমে রিকশাচালক থেকে হকার—সবাই লাভবান হয়। কিছু উদ্যোক্তা দক্ষিণ এশিয়ার বাজারেও প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ঘন ঘন লোডশেডিং ও গ্যাসসংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জের প্রায় ৩ হাজার ছোট-বড় হোসিয়ারি কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে কাজ বন্ধ থাকায় দৈনিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না কারখানাগুলো।
নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ, নয়ামাটি, উকিলপাড়া, পাইকপাড়া, শহীদনগর, বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকার কারখানায় সারি সারি মেশিনের শব্দে কর্মচাঞ্চল্য থাকার কথা। লোডশেডিংয়ের কারণে দিনের বড় অংশজুড়েই এসব কারখানার মেশিন বন্ধ থাকছে। কারখানায় উৎপাদিত পোশাক বিদেশে রপ্তানি না হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে এর বিপুল চাহিদা রয়েছে।
কারখানার মালিক মোহাম্মদ মেহেদী হাসান জানান, ‘আমার ছোট কারখানা, পুঁজি কম। ধারদেনা কইরা চালাইতাছি। কিন্তু কারেন্ট যা শুরু করসে! আগে শহরে কম যাইত, অহন গ্রামের চাইতে বেশি যায়। কারেন্ট যতক্ষণ থাকে না, ততক্ষণ বসে থাকি। এতবার কারেন্ট যায় যে প্রতিদিনের টার্গেট পূরণ হয় না।’
নয়ামাটির রহমান হোসিয়ারির মালিক বাদশা মিয়া বলেন, ‘কারেন্ট না থাকলে কারিগর বসে থাকে, উৎপাদন বন্ধ থাকে। কারখানা চালাইতে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা খরচ। কিশোরগঞ্জ, ভোলা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার পাইকাররা নিয়মিত মাল চায়, কিন্তু বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে দিতে পারি না।’
বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়েও জ্বালানি তেলের সংকটে পড়তে হচ্ছে বলে জানান নয়ামাটির আরেক ব্যবসায়ী। একই সঙ্গে গ্যাসসংকটের কারণে ডাইং ও ওয়াশিং কারখানায় কাজের গতি কমায় সময়মতো কাপড় ধুয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তারা।বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাঈদ আহম্মেদ স্বপন জানান, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কারখানা থেকে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার পোশাক দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়।
তিনি বলেন, ‘উৎপাদন কমে যাওয়ায় মালিকরা কারখানার ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও শ্রমিকদের বেতন নিয়ে চিন্তিত। এখনো পরিস্থিতি খুব খারাপ হয়নি, তবে সরকার বিদ্যুৎসহ জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে না পারলে সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে।’