ফাইল ছবি
রাজধানী ঢাকা ও শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের মধ্যে প্রতিদিন যাতায়াত করেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। কর্মজীবী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পথে দীর্ঘদিনের যানজট, ধীরগতির বাস ও সড়কের চাপ নিত্যদিনের ভোগান্তির কারণ। এ পরিস্থিতি বদলাতে গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত মেট্রোরেল চালুর পরিকল্পনা সামনে এসেছে।
প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-২ বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ করিডরে দ্রুতগতির গণপরিবহনের নতুন দ্বার খুলবে। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটে গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ সদর পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচলের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক রুট পরিকল্পনায় গাবতলী থেকে ঢাকা উদ্যান, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নিউমার্কেট, আজিমপুর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, গুলিস্তান, মতিঝিল, কমলাপুর, ডেমরা, সাইনবোর্ড হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর পর্যন্ত মেট্রোরেল নেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি গুলিস্তান থেকে নয়াবাজার হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত একটি শাখা লাইন রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
ঢাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সড়কে অতিরিক্ত চাপ। বিশেষ করে সাইনবোর্ড, চিটাগং রোড, সানারপাড়, শনিরআখড়া ও ডেমরা অংশে যানজট তৈরি হলে এর প্রভাব নারায়ণগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় পড়ে।
প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে অসংখ্য মানুষ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় চাকরি, ব্যবসা ও শিক্ষার প্রয়োজনে যাতায়াত করেন। একইভাবে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকেও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল ও ব্যবসাকেন্দ্রে আসেন কর্মজীবীরা। ফলে এই করিডরে দ্রুতগতির গণপরিবহন চালু হলে দুই শহরের মানুষের যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি সড়কের ওপর চাপও কমতে পারে।
পরিকল্পনাবিদদের হিসাবে, এই রুটে ভবিষ্যতে প্রতিদিন ১০ লাখের বেশি যাত্রী চলাচল করতে পারেন। সর্বোচ্চ চাহিদার ক্ষেত্রে যাত্রী সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রস্তাবিত লাইনটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পুরান ঢাকাকে সরাসরি মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করবে। বর্তমানে পুরান ঢাকার লালবাগ, চকবাজার, মিটফোর্ড, সদরঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো মেট্রোরেল সুবিধার বাইরে রয়েছে।
গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত শাখা লাইন হলে এসব এলাকার মানুষের জন্য দ্রুতগতির গণপরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে সদরঘাটের নৌপথ, পুরান ঢাকার ব্যবসাকেন্দ্র এবং নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে একটি সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
এমআরটি লাইন-২ বাস্তবায়িত হলে ঢাকার বিদ্যমান ও পরিকল্পনাধীন মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে এর সংযোগ তৈরি হবে। গাবতলীতে এমআরটি লাইন-৫, কমলাপুরে এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৬সহ বিভিন্ন রুটের সঙ্গে আন্তঃসংযোগের সুযোগ থাকবে।
এর ফলে নারায়ণগঞ্জের একজন যাত্রী মেট্রোরেলের মাধ্যমে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তুলনামূলক সহজে যাতায়াত করতে পারবেন। এতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাসের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি সড়কেও চাপ কমতে পারে।
প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনায় উড়াল ও ভূগর্ভস্থ—দুই ধরনের অবকাঠামো বিবেচনা করা হয়েছে। জনবসতিপূর্ণ ও ঐতিহাসিক এলাকার ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পথ নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অন্যদিকে তুলনামূলক প্রশস্ত ও নতুন নগরায়ণ এলাকায় উড়ালপথ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ডেমরা ও মাতুয়াইল এলাকায় ডিপো নির্মাণের জন্য জমি চিহ্নিত করার বিষয়টিও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
বড় প্রকল্প হলেও এর অর্থায়ন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ ও সহায়তার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, যাত্রী চাহিদা, পরিচালন ব্যয়, আয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা যোগাযোগের দীর্ঘদিনের সংকট বিবেচনায় মেট্রোরেল গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে। তবে প্রকল্পের ব্যয় ও অর্থায়ন কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে।
সবকিছু ঠিক থাকলে গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এমআরটি লাইন-২ শুধু দুই শহরের যোগাযোগব্যবস্থাই বদলাবে না, বরং নারায়ণগঞ্জের শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। তবে বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও অর্থায়নের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়াই এখন সবচেয়ে বড় ধাপ।

