বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

|

শ্রাবণ ২৬ ১৪৩৩

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

১৫ দিনের মধ্যে তানিয়া হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন, স্বামী গ্রেপ্তার

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ১৮:৩৩, ১১ আগস্ট ২০২৬

১৫ দিনের মধ্যে তানিয়া হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন, স্বামী গ্রেপ্তার

নিহতের স্বামী সোহাগ মিয়া জুলহাস গ্রেপ্তার

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গৃহবধূ তানিয়া আক্তারকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। হত্যাকাণ্ডের ১৫ দিনের মধ্যে নিহতের স্বামী সোহাগ মিয়া জুলহাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

পিবিআই জানায়, সংসারের অভাব-অনটন নিয়ে ঝগড়ার একপর্যায়ে স্ত্রীকে গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তিনি। হত্যার পর স্ত্রীর নাকফুল নিয়ে ঘরে তালা দিয়ে পালিয়ে যান সোহাগ।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ (বিপিএম) সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

গ্রেপ্তারকৃত আসামি সোহাগ মিয়া জুলহাস (৩৩) গাইবান্ধা সদর থানার পূর্ব কোমরজানি (ডাক্তার বাড়ি) এলাকার মো. সেকান্দার আলীর ছেলে। তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি পশ্চিমপাড়া মাতবর বাড়ি এলাকায় ভাড়া থাকতেন।

পিবিআই জানায়, গত ২৬ জুলাই সকালে সোহাগ তার স্ত্রী তানিয়ার খালা নাছিমা আক্তারের বাসায় গিয়ে তাদের ঘরের চাবি দিয়ে জানান, তানিয়া গার্মেন্টসে গেছেন। গার্মেন্টসের পিএমের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তাকে ছুটি দেওয়া হবে। দুপুরে যেন নাছিমা চাবি নিয়ে তাদের বাসায় যান, এমন কথাও বলে চলে যান তিনি।

পরে নাছিমা আক্তার তানিয়ার কর্মস্থলে গিয়ে জানতে পারেন, সেদিন তানিয়া গার্মেন্টসে যাননি। সন্দেহ হওয়ায় তিনি তানিয়ার বাসায় গিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা দেখতে পান। বাড়ির মালিকের ছেলের বউ শ্রাবন্তীকে সঙ্গে নিয়ে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন তিনি।

ঘরের মশারির ভেতরে তানিয়াকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে মশারি সরিয়ে নাছিমা তার নাক-মুখে রক্ত দেখতে পান। শরীর শক্ত হয়ে যাওয়ায় তিনি চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। এ ঘটনায় তানিয়ার খালা নাছিমা আক্তার বাদী হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

পিবিআইয়ের তদন্তে জানা যায়, ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে তানিয়া ও সোহাগের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে পরিবারের অমতে তারা বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকেই তাদের সংসারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কলহ চলছিল।

তদন্তে উঠে আসে, সোহাগের স্থায়ী কোনো কর্মসংস্থান ছিল না। সংসারের অভাব-অনটন ও আর্থিক বিষয় নিয়ে তানিয়ার সঙ্গে তার প্রায়ই ঝগড়া হতো। একপর্যায়ে তানিয়াকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে বলে তদন্তে তথ্য পায় পিবিআই।

মামলাটি পিবিআইয়ের সিডিউলভুক্ত হওয়ার পর গত ১০ আগস্ট স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে সংস্থাটি। এসআই মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়।

পিবিআই জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর সোহাগ তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে মেরাদিয়া ও ছোবাহানবাগ এলাকায় তার অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। এসব এলাকায় একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সোহাগের অবস্থান শনাক্ত করে পিবিআই। ১১ আগস্ট ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে গাইবান্ধা থেকে নারায়ণগঞ্জগামী একটি দূরপাল্লার বাসে তল্লাশি চালিয়ে ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকার চৌরঙ্গী ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পিবিআইয়ের তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৫ জুলাই দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে রাত ১টার মধ্যে সংসারের অভাব-অনটন নিয়ে তানিয়া ও সোহাগের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে সোহাগ তানিয়ার গলা চেপে ধরেন। এতে শ্বাসরোধ হয়ে তানিয়ার মৃত্যু হয়।

পরদিন সকালে তানিয়ার মরদেহ ঘরের ভেতরে রেখেই তার নাকে থাকা স্বর্ণের নাকফুল খুলে নেন সোহাগ। পরে ঘরের দরজায় তালা দিয়ে চাবি তানিয়ার খালা নাছিমা আক্তারের কাছে দিয়ে দেন। এরপর নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান তিনি।

গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহাগ তানিয়া হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। মঙ্গলবার তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তদন্তের মাধ্যমে তানিয়া হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।