ফাইল ছবি
মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য মৃত্যু। জন্মের পর থেকেই একদিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায় প্রতিটি মানুষ। কিন্তু এই চিরন্তন সত্যকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক নীরব অর্থনীতি—যেখানে কারো শেষ বিদায় অন্য কারো জীবিকার প্রধান উৎস। শহরের বিভিন্ন হাসপাতাল, কবরস্থান ও শ্মশানঘাটের আশপাশে গড়ে ওঠা শেষ বিদায় স্টোর গুলো সেই বাস্তবতারই জীবন্ত উদাহরণ।
হাসপাতালের গেট কিংবা কবরস্থানের পাশে ছোট ছোট দোকানে সাজানো থাকে কাফনের কাপড়, সাদা কাপড়, আতর, গোলাপজল, আগরবাতি, মাটির কলস, দাফন বা সৎকারের অন্যান্য সামগ্রী। কোনো পরিবার যখন প্রিয়জন হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই এসব দোকান হয়ে ওঠে তাদের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর একমাত্র জায়গা।
সম্প্রতি শহরের একটি কবরস্থানের পাশে অবস্থিত এমনই একটি দোকানে গিয়ে কথা হয় দোকান মালিক আব্দুল করিমের সঙ্গে। প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি এই পেশার সঙ্গে জড়িত। কথোপকথনে তিনি বলেন, আমরা কখনো চাই না কেউ মারা যাক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ মারা গেলে তবেই আমাদের বিক্রি হয়। দিনে কখনো ভালো বিক্রি হয়, আবার অনেক দিন বসে থাকতে হয়। এই আয়ের ওপরই আমার পরিবারের সবকিছু নির্ভর করে।
তার মতো আরও অনেকেই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। কেউ কাফনের কাপড় বিক্রি করেন, কেউ দাফনের সরঞ্জাম সরবরাহ করেন, আবার কেউ মৃতদেহ বহনের খাটিয়া ভাড়া দেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি মৃত্যুকে ঘিরে কয়েকজন মানুষের আয়-রোজগার নিশ্চিত হয় যেমন খাটিয়া বহনকারী, কবর খননকারী, মসজিদের খাদেম, এমনকি পরিবহন চালকরাও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হঠাৎ মৃত্যু হলে পরিবারগুলো প্রায়ই প্রস্তুত থাকে না। তখন তারা দ্রুত এসব দোকানে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করে। এ সময় দোকানদাররা শুধু পণ্য বিক্রিই করেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রে কী কী করতে হবে সে সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা দেন। ফলে তারা এক ধরনের মানবিক সহায়তাকারীর ভূমিকাও পালন করেন।
তবে এই পেশার সঙ্গে জড়িতদের মানসিক দিকটিও কম চ্যালেঞ্জিং নয়। প্রতিদিন মৃত্যুর খবর শোনা, শোকাহত মানুষের মুখোমুখি হওয়া এসব তাদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করে। এক দোকান কর্মচারী জানান, প্রথম দিকে খুব খারাপ লাগত। মানুষের কান্না দেখলে নিজেরও কষ্ট হতো। এখন কিছুটা অভ্যাস হয়ে গেছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা চাপ থেকেই যায়।
অন্যদিকে, সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি একটি প্রয়োজনীয় কিন্তু সংবেদনশীল পেশা। মানুষের জীবনের শেষ পর্যায়কে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে উঠেছে, তা সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এ বিষয়ে সচেতনতা ও মানবিকতা বজায় রাখা জরুরি।
মৃত্যুকে ঘিরে এই ধরনের ব্যবসা নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর সব দেশেই কোনো না কোনোভাবে এই সেবা রয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজে এটি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা কম হয়। আসলে যারা এই পেশায় আছেন, তারা সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি আরও বলেন, এখানে একটি দ্বৈত বাস্তবতা কাজ করে একদিকে মানুষের গভীর শোক, অন্যদিকে অন্য কারো জীবিকা। বিষয়টি আমাদের ভাবতে শেখায়, জীবন কতটা জটিল এবং পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল।
নারায়ণগঞ্জ শহরের কয়েকটি এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, এসব দোকান খুব বেশি চোখে পড়ে না। সাধারণ সময় এগুলো নীরবই থাকে। কিন্তু কোনো মৃত্যুর খবর এলেই হঠাৎ করে সেগুলো সচল হয়ে ওঠে। অনেক সময় রাত-বিরাতেও দোকান খোলা রাখতে হয়, কারণ মৃত্যু কোনো নির্দিষ্ট সময় মেনে আসে না।
এ পেশার সঙ্গে জড়িতরা কোনো বিলাসী জীবনযাপন করেন না। তাদের আয় অনিয়মিত, অনেকটাই নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর। তবুও জীবিকার তাগিদে তারা এই কাজ করে যাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, অন্য কোনো কাজের সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়েই এই পেশায় আসতে হয়েছে।
একজন তরুণ কর্মী বলেন, আমি আগে অন্য কাজ করতাম। পরে কাজ না পেয়ে এখানে যোগ দিই। শুরুতে অস্বস্তি লাগত, কিন্তু এখন এটাই আমার জীবিকা। পরিবারের কথা ভেবে সব মেনে নিতে হয়।
সবশেষে বলা যায়, শেষ বিদায় স্টোর শুধুমাত্র একটি দোকানের নাম নয় এটি আমাদের সমাজের এক কঠিন এবং নীরব বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এখানে একদিকে থাকে শোকাহত পরিবারের কান্না, অন্যদিকে থাকে জীবিকার সংগ্রাম।
জীবনের এই চক্রে মৃত্যু যেমন অবশ্যম্ভাবী, তেমনি মৃত্যুকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই পেশাগুলোও সমাজের জন্য অপরিহার্য। একজনের শেষ বিদায় হয়তো আরেকজনের জন্য নতুন করে বেঁচে থাকার পথ তৈরি করে দেয় এটাই জীবনের নির্মম কিন্তু সত্য বাস্তবতা।

