ফাইল ছবি
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) তিন অঞ্চলে চলতি কর আদায়ে গতি বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নারায়ণগঞ্জ সদর, কদমরসুল ও সিদ্ধিরগঞ্জ—এই তিন অঞ্চলে করের মোট দাবি ছিল ৯৩ কোটি ৭৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। এর বিপরীতে এ পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৫২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ফলে এখনো বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। তবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের দাবি, বকেয়া কর আদায়ে বিশেষ তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর কর আদায়ের হারও বেড়েছে।
নাসিকের হিসাব অনুযায়ী, তিন অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে। এ অঞ্চলে বকেয়ার পরিমাণ ১৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে বকেয়া রয়েছে ১৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আর কদমরসুল অঞ্চলে বকেয়া রয়েছে ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট বকেয়ার প্রায় অর্ধেকই সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ সদর ও সিদ্ধিরগঞ্জ—এই দুই অঞ্চলে সম্মিলিত বকেয়া ৩৭ কোটি টাকার বেশি।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, কর আদায় নাসিকের নিজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। নাগরিক সেবা সম্প্রসারণ, সড়ক উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিধন, সড়কবাতি, পানি সরবরাহসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে রাজস্ব আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বকেয়া কর আদায় করতে পারলে সিটি করপোরেশনের আর্থিক সক্ষমতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে বকেয়া করের বড় অঙ্কটি নাসিকের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট দাবির প্রায় ৫৬ শতাংশ আদায় হলেও ৪৪ শতাংশের কাছাকাছি অর্থ এখনো আদায়ের বাইরে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের বকেয়া কর আদায় করা গেলে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
নাসিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিন অঞ্চলে মোট করের দাবি ছিল ৯৩ কোটি ৭৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৫২ কোটি ৪১ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, বকেয়া রয়েছে ৪১ কোটি ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। তবে অঞ্চলভিত্তিক বকেয়ার হিসাবের ক্ষেত্রে মোট অঙ্ক ৪১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার কাছাকাছি। প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে ১৭ কোটি ১৬ লাখ, কদমরসুলে ৪ কোটি ২৯ লাখ এবং সিদ্ধিরগঞ্জে ১৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।
অঞ্চলভেদে কর আদায়ের চিত্রেও পার্থক্য রয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জে শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার সংখ্যা বেশি হওয়ায় এ অঞ্চলে করের দাবিও তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে এখানে বকেয়ার অঙ্কও বেশি। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ সদর অঞ্চলে নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকার বড় একটি অংশ থাকায় এই অঞ্চলেও বিপুল পরিমাণ কর আদায়ের সুযোগ রয়েছে।
নাসিকের সাম্প্রতিক রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কর মেলাকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা। চলতি বছরের কর মেলায় ১৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। একদিকে নাগরিকদের কর পরিশোধে উৎসাহিত করা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বকেয়া কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কর মেলার মাধ্যমে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক করদাতাকে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি কর পরিশোধের প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, নাগরিকদের কর পরিশোধে উৎসাহিত করতে নিয়মিত করদাতাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা রাখা হচ্ছে। করদাতাদের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব কমিয়ে স্বচ্ছ ও সহজ কর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, বাকি করও দ্রুত আদায় হবে বলে আশা করছেন তারা। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার জনগণ উন্নয়নে বিশ্বাসী। অধিকাংশ নাগরিক নিয়মিত কর পরিশোধ করেন। নিয়মিত করদাতাদের সাধ্যমতো ছাড়ও দেওয়া হয়। এবারের কর মেলায় ১৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা আদায় হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে কোনো ধরনের নতুন কর বাড়ানো হয়নি। জনগণকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়াই সিটি করপোরেশনের লক্ষ্য।
নাসিকের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ১ হাজার ৬০ কোটি ৯৯ লাখ ৭৫ হাজার ১১২ টাকা। এটি সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নাসিকের বাজেট ছিল ৭৭৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বড় বাজেট বাস্তবায়নে নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের ওপরও চাপ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন কোনো কর আরোপ না করেও বড় বাজেট বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফলে বিদ্যমান করের আওতা বৃদ্ধি, কর আদায়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং বকেয়া কর আদায়ে সাফল্য অর্জনকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে ৪১ কোটি টাকার বেশি বকেয়া কর আদায় করতে পারলে নাসিকের নিজস্ব রাজস্ব আয় শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, করের অর্থ যেন নাগরিক সেবায় দৃশ্যমানভাবে ব্যয় হয়। নারায়ণগঞ্জ শহরে সড়ক সংস্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য অপসারণ, মশক নিয়ন্ত্রণ, পানি সরবরাহ ও সড়কবাতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নাগরিকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে করের অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহারের দাবি রয়েছে তাদের।

