বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

|

আশ্বিন ২৯ ১৪৩৩

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

রঙিন চাদরের আড়ালে তাঁতিদের বিবর্ণ জীবন, হারিয়ে যাওয়ার পথে রূপগঞ্জের ঐতিহ্য

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ১২:১৯, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

রঙিন চাদরের আড়ালে তাঁতিদের বিবর্ণ জীবন, হারিয়ে যাওয়ার পথে রূপগঞ্জের ঐতিহ্য

ফাইল ছবি

একসময় শীত আসার আগেই তাঁতের খটখট শব্দে মুখর হয়ে উঠত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার চাদর তৈরির কারখানাগুলো। সুতোয় সুতোয় বুনন আর কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হতো বাহারি রং ও নকশার শীতের চাদর। কিন্তু কালের বিবর্তনে নানা সংকটে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে দীর্ঘ তিন মাস উৎপাদন বন্ধ থাকার পর এবার সুতার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে বিপাকে পড়েছেন তাঁত মালিক ও কারিগররা। ফলে শীতের মৌসুম সামনে রেখেও চাহিদা অনুযায়ী চাদর উৎপাদন করতে পারছেন না তাঁতিরা।

সরেজমিনে কাঞ্চন পৌরসভার চাদর তৈরির কারখানাগুলো ঘুরে দেখা যায়, কোথাও সুতা থেকে তৈরি হচ্ছে গ্রে কাপড়, আবার কোথাও সেই কাপড়ে বাহারি রং ও নকশার সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন শীতের চাদর। কারিগরদের কেউ তাঁত মেশিন চালাচ্ছেন, কেউ সুতা প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ তৈরি চাদর বাজারজাত করার জন্য গুছিয়ে রাখছেন। তবে আগের মতো কারখানাগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য নেই। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক তাঁত মালিক ও কারিগর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

স্থানীয় তাঁতশিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বছরের প্রায় ছয় মাস চলে শীতের চাদর তৈরির মৌসুমি কার্যক্রম। একসময় শীতের আগমনের কয়েক মাস আগে থেকেই কারখানাগুলোতে দিনরাত উৎপাদন চলত। এখানকার তৈরি রংবেরঙের চাদর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। তবে বিদ্যুৎ সংকট, সুতার মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

চাদর তৈরির কারিগর রাহাত বলেন, “আগে শীত আসার কয়েক মাস আগে থেকেই আমাদের কাজের অনেক চাপ থাকত। দিনরাত তাঁত মেশিন চালিয়ে চাদর তৈরি করতাম। কিন্তু এখন সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো কাজ হচ্ছে না। কাজ কমে যাওয়ায় আমাদের আয়ও কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

আরেক তাঁতি করিম বলেন, “বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে দীর্ঘদিন ঠিকমতো কাজ করতে পারিনি। এখন আবার সুতার দাম বেড়ে গেছে। মালিকরা পর্যাপ্ত সুতা কিনতে পারছেন না। ফলে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। আমরা চাই সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখুক এবং সুতার দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।

চাদর তৈরির কারিগর জলিল বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত আছি। একসময় কাঞ্চনের চাদরের অনেক চাহিদা ছিল। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এখানকার চাদর যেত। কিন্তু এখন নানা সমস্যার কারণে এই শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সরকার সহযোগিতা না করলে ভবিষ্যতে এই পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

কাঞ্চন পৌর টেক্সটাইল মালিক সমিতির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বাবু জানান, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে দীর্ঘ তিন মাস উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এখন নতুন করে সুতার মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে চাদর তৈরির কারখানাগুলোর মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

তিনি আরও জানান, এবারের শীতে ঠান্ডার তীব্রতা বেশি হলে চাদরের চাহিদা বাড়তে পারে। বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে তাঁত মালিকরা লোকসান কাটিয়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। তবে সুতার দাম নিয়ন্ত্রণ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে স্থানীয় তাঁত মালিক ও কারিগরদের দাবি, রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী চাদর শিল্প শুধু স্থানীয় অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও একটি সম্ভাবনাময় খাত। এই শিল্প বিলুপ্ত হয়ে গেলে একদিকে যেমন বহু কারিগর কর্মসংস্থান হারাবেন, অন্যদিকে রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই শিল্পটি রক্ষায় সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম আব্দুল বিন শফিক জানান, সুতার মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে সুতার মূল্যবৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণ প্রশাসনকে জানানো হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

স্থানীয়দের মতে, শত সংকটের মধ্যেও থেমে নেই তাঁতের চাকা। শীতের বাজার ধরতে এখনো পরিশ্রম করে যাচ্ছেন কারিগররা। তবে সুতার মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট ও বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে একসময় পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী চাদর শিল্প। তাই শিল্পটির ঐতিহ্য রক্ষা ও কারিগরদের জীবিকা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁত মালিক ও শ্রমিকরা।