বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬

|

পৌষ ২৩ ১৪৩২

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

বছরজুড়েই অপরাধপ্রবণ ও আতঙ্কের ছিল নারায়ণগঞ্জ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ১২:৫০, ৬ জানুয়ারি ২০২৬

বছরজুড়েই অপরাধপ্রবণ ও আতঙ্কের ছিল নারায়ণগঞ্জ

ফাইল ছবি

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় নারায়ণগঞ্জের চেনা চিত্র। অলিগলিতে মানুষের চলাচল কমে আসে, দোকানের শাটার নেমে যায় দ্রুত, বাসার দরজায় অতিরিক্ত তালা ঝোলে। শহরের মানুষ এখন দিনের আলোয় যতটা নিশ্চিন্ত, রাত নামলেই ততটাই সতর্ক। অপরাধের আশঙ্কা, অজানা আতঙ্ক আর হঠাৎ ঘটে যাওয়া সহিংসতার ভয় নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। শিল্প আর বাণিজ্যের শহর হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ এখন অনেকের কাছেই নিরাপত্তাহীন এক নগরীর নাম।

​এই নিরাপত্তাহীনতার পেছনে যে পরিসংখ্যান, তা আরও উদ্বেগজনক। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলায় খুন হয়েছেন ১২৬ জন। মাসের হিসেবে গড়ে ১০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই সংখ্যা শুধু একটি বছরের নয়, বরং একটি ধারাবাহিক অবনতির ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে বেড়েছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক অপরাধ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ভয়ংকরভাবে বেড়ে ওঠা গণপিটুনির ঘটনা।

​পুলিশের নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত ১৪ বছরে নারায়ণগঞ্জ জেলায় খুনের শিকার হয়েছেন মোট ১ হাজার ৬৮৩ জন। এই সময়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ২৪৫টি, ছিনতাই ২৮৫টি, নারী নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৯৯৭টি, চুরি ২ হাজার ২০৪টি এবং মাদক সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ২৭ হাজার ৬৭৩টি।

​২০২৫ সালের অপরাধচিত্র আলাদাভাবে দেখলে পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ১২ মাসে খুন ছাড়াও চুরি হয়েছে ১৭৫টি, ছিনতাই ৭০টি, ডাকাতি ২৮টি এবং মাদক মামলা হয়েছে ১ হাজার ২৯৭টি। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ মনে করেন, প্রকৃত অপরাধচিত্র এর চেয়েও ভয়াবহ। অনেক ভুক্তভোগী থানায় মামলা করতে চান না। পুলিশের কাছে গেলে হয়রানি, সময়ক্ষেপণ এবং শেষ পর্যন্ত বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা তাদের পিছিয়ে দেয়। ফলে বহু অপরাধ নীরবে চাপা পড়ে যায়।

​নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩৪০টি ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ৬২ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১২টি, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৮ জনকে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা ছিল ১২২টি এবং ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ২১টি। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে ৩১৪টি।

​বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি রীনা আহমেদ বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল একটি ব্যক্তি বা পরিবারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না। এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে এই সহিংসতা থামানো কঠিন।

​২০২৫ সালের হত্যাকান্ডগুলো শুধু সংখ্যায় নয়, বর্বরতার দিক থেকেও একে অন্যকে ছাড়িয়ে গেছে।

​ফেব্রুয়ারির শুরুতে রূপগঞ্জের তারাবো পৌরসভায় আধিপত্য বিস্তার ও মাদক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান দুই যুবক। 

কয়েক দিনের ব্যবধানে ফতুল্লার পূর্বলালপুর রেললাইন এলাকায় প্রকাশ্য গুলিতে নিহত হন এক বিএনপি নেতা।

​মার্চের শেষ দিকে ফতুল্লার কাশিপুর এলাকায় তুচ্ছ তর্কাতর্কির জেরে পাভেল নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়।

​এপ্রিল মাসে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পশ্চিমপাড়া এলাকা থেকে উদ্ধার হয় দুই নারী ও এক শিশুর খণ্ডিত মরদেহ, যা পুরো জেলাজুড়ে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

​অক্টোবরে ফতুল্লার তক্কার মাঠ নন্দলালপুর সড়কের পাশ থেকে ড্রামের ভেতরে মো. নয়ন নামে এক ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

​জুলাই মাসে আড়াইহাজারে বাবাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে ছেলের বিরুদ্ধে।

​এছাড়াও, রাজনৈতিক সহিংসতাও বছরজুড়ে প্রাণহানির তালিকাকে দীর্ঘ করেছে। মার্চে রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। জুনে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে গুলিতে প্রাণ হারান এক ব্যবসায়ী।

​সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে সামনে এসেছে গণপিটুনি। চোর বা ছিনতাইকারী সন্দেহ, ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা মুহূর্তের উত্তেজনায় মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। গত ১২ মাসে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন। নভেম্বরের শেষ দিকে বন্দরের সোনাচড়া এলাকায় চোর সন্দেহে পারভেজ নামে এক নির্মাণ শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

​এছাড়া আড়াইহাজার, বন্দর ও সোনারগাঁ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ডাকাত সন্দেহ, চাঁদাবাজির অভিযোগ, পারিবারিক কলহ এবং জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে একের পর এক গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে।

​আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তার আর মামলা দিয়ে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অপরাধ দমনে প্রয়োজন দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানো, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখার কার্যকর উদ্যোগ। অন্যথায় শিল্প, সংস্কৃতি আর ইতিহাসে সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ মানুষের কাছে নিরাপত্তাহীন এক নগরী হিসেবেই পরিচিত থেকে যাবে।

​এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, নারায়ণগঞ্জ আগের তুলনায় এখন অনেকটাই ভালো। আমরা আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে আরও সচেষ্ট। আমাদের নিয়মিত টহল বাড়ানো হয়েছে। সবার সচেতনতা বৃদ্ধিই পারে শৃঙ্খলা আরও উন্নত করতে।