ফাইল ছবি
নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর নির্মাণাধীন কদমরসুল সেতুর কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা নিয়ে নতুন করে জটিলতা দেখা দিয়েছে। সেতু নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন প্রয়োজনীয় জমি এখনো পুরোপুরি হস্তান্তর না হওয়ায় প্রকল্পের পরবর্তী কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় নির্মাণকাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ২০ দিনের মধ্যে চাহিত জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়েকে তাগাদা দিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-১) মো. বেলাল হোসেন গত ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক বরাবর এ বিষয়ে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের গুদারাঘাটের কাছে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর ‘কদমরসুল সেতু নির্মাণ প্রকল্প (১ম সংশোধিত)’-এর কাজ চলমান রয়েছে। সেতুর নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে রেলওয়ের মালিকানাধীন প্রয়োজনীয় জমির দখল দ্রুত হস্তান্তর করা অত্যাবশ্যক।
পাইলের কাজ প্রায় শেষ: এলজিইডি সূত্রের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সেতুর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশের পাইল নির্মাণকাজ বর্তমানে প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এখন সেতুর পরবর্তী ধাপের নির্মাণকাজ এগিয়ে নিতে চাহিত জমির প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। জমি হাতে না পেলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী কাজ শুরু করতে পারবে না।
এলজিইডির আশঙ্কা, আগামী ২০ দিনের মধ্যে জমি হস্তান্তর করা না হলে নির্মাণকাজের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হবে। এতে ঠিকাদারের কাজের অগ্রগতি থেমে যেতে পারে। পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সময় বা ক্ষতিপূরণের দাবি উত্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন সময়ের ওপর।
কদমরসুল সেতু নারায়ণগঞ্জের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার একটি প্রকল্প। শীতলক্ষ্যা নদীর দুই পাড়ের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে সেতুটিকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে নির্মাণকাজের কোনো পর্যায়ে জমি-সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু প্রকল্পের ওপর নয়, বৃহত্তর যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।
২০২৩ সালে সমঝোতা, এখনো জমি হস্তান্তর বাকি: রেলওয়ের জমি হস্তান্তরের বিষয়ে এলজিইডি ও বাংলাদেশ রেলওয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছিল ২০২৩ সালের ১৮ মে। অর্থাৎ জমি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে দুই সরকারি সংস্থার মধ্যে সমঝোতা হওয়ার পরও বাস্তবে জমির দখল বুঝে পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।
এরপর গত ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় যে বাংলাদেশ রেলওয়ে এলজিইডির চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তর করবে। ওই জমির ওপর থাকা স্থাপনার ক্ষতিপূরণ সরকারি বিধি অনুযায়ী পরিশোধ করবে এলজিইডি।
তবে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও পরিশোধের প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় জমি হস্তান্তরের আগে ক্ষতিপূরণের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে এলজিইডি। এ কারণে চিঠিতে জমির দখল হস্তান্তরকে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও পরিশোধের সঙ্গে পূর্বশর্ত হিসেবে যুক্ত না রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এলজিইডির যুক্তি, জমির দখল হস্তান্তর এবং স্থাপনার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও পরিশোধ—দুই প্রক্রিয়া একই সঙ্গে চলতে পারে। এতে একদিকে প্রকল্পের কাজ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে জমির ওপর থাকা স্থাপনার মালিকদের আইনানুগ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান থাকবে।
সময়ক্ষেপণে বাড়তে পারে প্রকল্প ব্যয়: অবকাঠামো প্রকল্পে জমি বুঝে না পাওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে নির্মাণকাজ শুরুর পর প্রয়োজনীয় জমি নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে তার প্রভাব প্রকল্পের সময় ও ব্যয় দুই ক্ষেত্রেই পড়ে। কদমরসুল সেতুর ক্ষেত্রেও এলজিইডি ঠিক এ ধরনের আশঙ্কার কথাই জানিয়েছে।
জমি হস্তান্তরে বিলম্ব হলে ঠিকাদারের নির্মাণ পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হতে পারে। একপর্যায়ে যন্ত্রপাতি ও শ্রমিক বসিয়ে রাখার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এতে বাড়তি ব্যয়ের দাবি উঠতে পারে। আবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে প্রকল্পের সার্বিক সুফল পাওয়ার সময়ও পিছিয়ে যাবে।
এ কারণে এলজিইডি দ্রুত জমি বুঝে নিয়ে নির্মাণকাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়। চিঠিতে নারায়ণগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এ সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
২৩ আগস্ট সীমানা নির্ধারণ: এদিকে চাহিত জমির সীমানা নির্ধারণের কাজ আগামী ২৩ আগস্ট সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে এলজিইডি। এজন্য ওই দিন বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন উপযুক্ত প্রতিনিধি উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে রেলওয়ের কোন অংশের জমি প্রকল্পের প্রয়োজনে হস্তান্তর করা হবে, তা স্পষ্ট হবে। এরপর দখল বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদী পারাপারে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের দুর্ভোগ রয়েছে। ফেরিঘাট ও বিদ্যমান সড়ক যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দুই পাড়ের যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে কদমরসুল সেতুর গুরুত্ব রয়েছে। শিল্পাঞ্চল, আবাসিক এলাকা ও নগর যোগাযোগের ওপরও এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে জমি হস্তান্তরের বিষয়টি যেন নতুন কোনো দীর্ঘসূত্রতার কারণ না হয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের। এলজিইডির ২০ দিনের সময়সীমার মধ্যে রেলওয়ের জমি হস্তান্তর করা গেলে নির্মাণকাজের গতি ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যথায় জমি-সংক্রান্ত জটিলতা কদমরসুল সেতুর নির্মাণকাজের সময়সূচিকে আরও পিছিয়ে দিতে পারে।

