ফাইল ছবি
বন্দরে লক্ষণখোলা আলহাজ্ব ফজলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহতাবউদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম , দূর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি আমির হোসেন বাদশা ও কয়েকজন অভিভাবক সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণসহ নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর।
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, নিরীক্ষা কমিটির কাছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আর্থিক হিসাবের বিবরণী জমা না দেওয়া। ৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা তছরুপের ঘটনা ধরা পড়ার পর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া । ক্যাশ বইয়ে ৮ মাস ধরে আর্থিক বিবরণী লিপিবদ্ধ না করা এবং বিদ্যালয়ের তহবিল ব্যাংকে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ব্যয় করা। বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও যথাসময়ে উপস্থিত না হওয়া, ক্লাস না নেওয়া এবং শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি সৃষ্টি করা । মূল্যায়ন পরীক্ষার নামে অর্থ সংগ্রহ করে ভাগবাটোয়ারা করা। বিভিন্ন প্রকাশনীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ এবং টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীকে টাকার বিনিময়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া । এ ছাড়া বিদ্যালয় সংলগ্ন চায়না ব্যাটারি কারখানার কাছ থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা গ্রহণেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি আমির হোসেন বাদশা জানান, ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর মাহতাবউদ্দিন প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই বিদ্যালয়টিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। যোগদানের পর থেকে অদ্যবধি তিনি বিদ্যালয়ের আর্থিক হিসাব ম্যানেজিং কমিটির কাছে পেশ করেননি। হিসাব জমা দেওয়ার তাগিদ প্রদানের জন্য ২০২৪ সালের ১১ জুলাই অভিভাবক প্রতিনিধি মো. রাজা মিয়া, শিক্ষক প্রতিনিধি মো. দেলোয়ার হোসেন ও সহকারী শিক্ষক রোকেয়া আখতারকে নিয়ে গঠন করা হয় তিন সদস্যের নিরীক্ষা কমিটি। এই কমিটি ১০ দিনের মধ্যে হিসাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দিলেও প্রধান শিক্ষক তা অমান্য করেন। প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের ৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা তছরুপ করেন। তদন্তে টাকা আত্মসাতের বিষয়টি ধরা পড়ার পর তিনি এ টাকা স্কুল ফান্ডে জমা দেন। তিনি জানান, ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় আড়াইশ’ শিক্ষার্থী রয়েছে। বর্তমান প্রধান শিক্ষক যোগদানের আগে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল পাঁচ শতাধিক। প্রধান শিক্ষকের অদক্ষতার কারণে ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তিনি একজন দুর্নীতিবাজ ও স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তি। তিনি রাজনীতি ও পরিবহণ ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাই স্কুলের লেখাপড়ার মানোন্নয়নের দিকে তার মনোযোগ নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক প্রায় প্রতিদিনই বিদ্যালয়ে দেরিতে উপস্থিত হন এবং নানা অজুহাতে অনেক সময় আসেনই না।
এ দিকে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্দেশনায় উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর সুরাইয়া ইসলামকে আহবায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বন্দর উপজেলা প্রশাসন। নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসও অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে।
বন্দর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আবদুল কাইয়ুম খানের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন অভিযোগের বিষয়টি তার জানা নেই। ইউএনও অফিসে কয়েকবার খোঁজ নিয়েও অভিযোগের কোন হদিস পাননি বলে জানান। তবে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ পেশের পরামর্শ দেন তিনি।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ আতিকুর রহমান বলেন,লক্ষণখোলা আলহাজ্ব ফজলুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করে শিক্ষা অফিস। অভিযোগের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এস এম মোসলেম উদ্দিন জানান, প্রধান শিক্ষক মাহতাবউদ্দিনকে শোকজ করা হয়েছে। তিনি শোকজের জবাব দিয়েছেন। ফাইল উঠানোর পর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শিগগির ফাইলটি পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
অভিযোগের ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক মাহতাবউদ্দিন বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কারণ দর্শানোর নোটিশ তিনি পেয়েছেন। তিন সপ্তাহ আগে তিনি এর জবাব দিয়েছেন। তবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই এবং টাকা আত্মসাতের বিষয়টি সঠিক নয় বলে তিনি জানান। যোগদানের পর থেকে সাড়ে ১৭ মাস ধরে তিনি এমপিওর বেতন ভাতাদি পাননি। ফলে পারিবারিক প্রয়োজনে ও চিকিৎসার জন্য তিনি স্কুলের টাকা নিয়েছেন এবং পরে এই টাকা পরিশোধ করেছেন বলে জানান।

