ফাইল ছবি
ঈদ মানেই নতুন পোশাকের আনন্দ। আর বাঙালি নারীদের পছন্দের তালিকায় প্রথমেই যে ঐতিহ্যবাহী পোশাকটির নাম আসে—তা হলো ইউনেস্কো স্বীকৃত জি আই পণ্য জামদানি শাড়ি। ঈদকে সামনে রেখে সেই জামদানির চাহিদা এখন তুঙ্গে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবো বিসিক শিল্পনগরী ও জামদানি হাটে বইছে দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের আনাগোনা।
আকাশ থেকে পাখির দৃষ্টিতে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবো এলাকায় গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী জামদানি বিসিক শিল্পনগরী। এখানে জামদানি উদ্যোক্তাদের রয়েছে ৪১৪টি প্লট। সকাল ছয়টা থেকে রাত দশটা—বিরামহীন পরিশ্রমে জামদানি কারিগর মনির, রুবেল, আমজাদ, মতিন এবং খলিলুর রহমান সহ অনেক তাঁতিদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে এক একটি জামদানি শাড়ি।
রেশম ও জরি সহ বেশ কয়েক প্রকার সুতার বুননে ফুটে উঠছে পান্না হাজার, তেরছা, পানসি, ময়ূরপঙ্খী, বটপাতা, করলা, জাল, বুটিদার, জলপাড়, ডুরিয়া, বলিহার, কটিহার, কলকাপাড়সহ নান্দনিক সব নকশা। এ যেন শাড়ি নয়—রঙধনুর রঙে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন জামদানিপল্লীর কারিগররা।
তারা জানান, ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছি। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত জামদানি তৈরির কাজ করছি। এখানে পাঁচ হাজার টাকা থেকে লাখ টাকার শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে।
ইংল্যান্ডের ২০ জনের একটি প্রতিনিধি দল রূপগঞ্জের জামদানি বিসিক শিল্পনগরী ঘুরে দেখেন। এখানকার টুরিস্ট লিডার অল্টেন জানান, এটাই আমাদের প্রথম বাংলাদেশ ভ্রমণ এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ এই কারখানাটি পরিদর্শন করতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। এখানে এসে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও প্রাচীন বুননশৈলী সরাসরি দেখতে পেরে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি—বিশেষ করে এমন এক আধুনিক যুগে, যখন প্রায় সবকিছুই যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি হয়।
টুরিস্ট লিডার অল্টেন আরও জানান, এই সুন্দর ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আপনাদের আন্তরিক প্রচেষ্টাকে আমরা গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি। আমাদের এখানে আসার সুযোগ করে দেওয়া এবং বাংলাদেশে আমাদের যে আন্তরিক আতিথেয়তা দেখিয়েছে তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
রাজধানী ঢাকার রামপুরার সাদিয়া আক্তার, গুলশানের আসমাতলী, বনানীর তামান্না আক্তার জামদানি কিনতে এসে জানান, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন হলো জামদানি শাড়ি। যুগের পর যুগ ধরে এই শাড়ির অবদান কখনো ফুরায়নি, ফুরায়নি এর চাহিদাও। আমাদের বাংলার নারীসমাজ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জামদানির সৌন্দর্য, কারুকার্য ও ঐতিহ্যকে আপন করে নিয়েছে।
সাদিয়া আক্তার বলেন, আমার নিজের জামদানির প্রতি ভালোবাসাও এসেছে পরিবার থেকেই—আমার আম্মুর কাছ থেকে। আর তিনি পেয়েছেন তাঁর পরিবারের অন্য নারীদের কাছ থেকে। এভাবেই জামদানি শুধু একটি পোশাক নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য উত্তরাধিকার হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, বাংলার এই অপূর্ব শিল্প এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অর্জন করেছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও জামদানি শাড়ি রপ্তানি হচ্ছে এবং বিশ্বজুড়ে এর কদর বাড়ছে।
ঈদকে সামনে রেখে জামদানির হাটগুলোতে ক্রেতা ও পাইকারদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠেছে। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা সরেজমিনে উৎপাদন দেখে মুগ্ধ ও আনন্দিত।
মোহনা জামদানি হাউজের কর্ণধার মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, বর্তমানে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কাপলদের মধ্যে ম্যাচিং পোশাকের একটি বিশেষ ট্রেন্ড গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে বয়ফ্রেন্ড–গার্লফ্রেন্ড কিংবা স্বামী–স্ত্রী—দুজনের জন্য একই ডিজাইন বা রঙের জামদানি শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরার আগ্রহ অনেক বেড়েছে। এই কারণে এখন আমরা প্রচুর পরিমাণে ম্যাচিং জামদানি সেট তৈরি করছি। আগে জামদানি মূলত ঐতিহ্যবাহী শাড়ি হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল। তবে এখন নতুন ডিজাইন ও আধুনিক রুচির কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছেও এটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পরিবারের অভিভাবকরাও এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, আমরা গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের জামদানি তৈরি করে থাকি। সাধারণ মানের জামদানি সাধারণত ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। তবে যদি কেউ বেশি গর্জিয়াস, ভারী কাজের বা বিশেষ ডিজাইনের জামদানি চান, তাহলে তার দাম এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্তও হতে পারে।
জামদানির দামের মূল পার্থক্য হয় কাজের ওপর। যত বেশি সূক্ষ্ম ও জটিল নকশা, যত বেশি হাতের কাজ—তত বেশি সময় ও শ্রম লাগে, ফলে দামও বাড়ে বলে জানান কারিগররা।
নারায়ণগঞ্জের জামদানিপল্লীতে সারা বছরই জামদানি পাওয়া যায়। বিভিন্ন মৌসুমে বা অর্ডার অনুযায়ী কারিগররা কাপড় তৈরি করে দেন। যে কোনো সময় যোগাযোগ করলে গ্রাহকের পছন্দমতো ডিজাইন ও বাজেট অনুযায়ী জামদানি সরবরাহ করেন তারা।
ঈদকে সামনে রেখে জামদানিপল্লীর কাজ ও ব্যবসা বর্তমানে খুব ভালো চলছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
শাকিল জামদানি তাঁতঘরের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, জামদানির চাহিদা এখন অনেক বেড়েছে। সেই চাহিদা পূরণ করতে আমরা নিয়মিত নতুন নতুন ডিজাইন ও উন্নত মানের কালেকশন তৈরি করছি। দক্ষ কারিগরদের দিয়ে উন্নত মানের শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের তৈরি জামদানি দেশ ছাড়িয়ে এখন বিদেশেও ব্যাপক সাড়া পাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত জামদানি যাচ্ছে ভারত, আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। প্রবাসী বাঙালি ও বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও এর চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। দেশীয় ঐতিহ্যের এই জামদানি এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের সুনাম ছড়িয়ে দিচ্ছে।
রাজধানী হকার্স মার্কেটের জামদানি ভবনের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ রাজিব চৌধুরী জামদানির হাটে শাড়ি কিনতে এসেছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে জামদানির চাহিদা শুধু ঈদকেন্দ্রিক নয়—সারা বছরই এর ভালো বিক্রি থাকে। ঈদকে ঘিরে বিক্রি সামান্য কিছুটা বাড়লেও সেটি আমাদের নিয়মিত ভালো বিক্রির অংশ হিসেবেই ধরা যায়। কারণ জামদানি এমন একটি পোশাক, যা যেকোনো অনুষ্ঠান ও উপলক্ষে সমানভাবে সমাদৃত। তাই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঈদের বাজারের চেয়ে স্বাভাবিক সময়ের বাজারেই জামদানির বিক্রি বেশি হয়ে থাকে। আমাদের শোরুমের জন্য এই হাট থেকে প্রায় ৫ লাখ টাকার জামদানি শাড়ি কিনেছি। বর্তমানে এখানের জামদানির বাজার ভালো। চার–পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২০–২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দামের জামদানি পাওয়া যায়, যা সম্পূর্ণভাবে কাজের নকশা ও মানের ওপর নির্ভর করে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ জামদানি বিসিক শিল্পনগরীর সরকারি দায়িত্বরত কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, “রূপগঞ্জের বিসিক শিল্পনগরীতে ৪১৪টি প্লটে সারা বছর জামদানি শাড়ি, থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবি তৈরি হয়। বছরে হাজার কোটি টাকার রপ্তানি ও বিক্রি হয়। আশা আশা করা হচ্ছে, এবারের ঈদে শুধু এখানেই ২০০ কোটি টাকার বেশি জামদানি বিক্রি হবে।”

