শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

|

শ্রাবণ ২৯ ১৪৩৩

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

রূপগঞ্জ-আড়াইহাজারের বিদ্যুৎ সংকট, কোরিয়ান বিশেষজ্ঞ দলের অপেক্ষায় প্রকল্প

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ২১:১৭, ১৪ আগস্ট ২০২৬

রূপগঞ্জ-আড়াইহাজারের বিদ্যুৎ সংকট, কোরিয়ান বিশেষজ্ঞ দলের অপেক্ষায় প্রকল্প

ফাইল ছবি

একটি গ্রিড চালু হলে বদলে যেতে পারে নারায়ণগঞ্জের দুই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি। সব কাজ শেষ কোরিয়ান একটি প্রকৌশলী দল এসে যে কাজ শেষ করতে বড়জোর সাত থেকে ১০ দিন সময় লাগার কথা, সেই কাজের জন্য দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে লাখ লাখ মানুষকে। বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন, ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানার উৎপাদন, বাড়ছে ব্যবসায়ীদের ব্যয় ও দুর্ভোগ।

আড়াইহাজার উপজেলার বৈলারকান্দি এলাকায় ২০২০ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়া আড়াইহাজার ১৩২/৩৩ কেভি, ১৬০/২৪০ এমভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রিড উপকেন্দ্র ২০২৩ সালে চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো গ্রিডটি চালু হয়নি। অথচ সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অবশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ সম্পন্ন করতে কোরিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল এলেই কাজ শেষ করা সম্ভব। আর পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে সর্বোচ্চ সাত থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে।

বর্তমানে বিদ্যুতের লোডশেডিং এর কারণে রূপগঞ্জে শিল্প কলকারখানার উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বেকার হয়ে পড়ছে হাজার হাজার শ্রমিক। কমে যাচ্ছে আয় রোজগার। জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকা মার্কেট গুলোতে ক্রেতা শূন্য হয়ে পড়েছে। ব্যাহত হচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের লেখা পড়া।

তবে, রূপগঞ্জ-আড়াইহাজার শিল্পাঞ্চলের জন্য স্থাপিত বিদ্যুতের নতুন গ্রীড চালু হলে কমবে বিদ্যুৎ সংকট। দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট কাটিয়ে উঠার আশ্বাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ।

প্রশ্ন উঠেছে যে কাজ শেষ করতে মাত্র কয়েক দিন প্রয়োজন, সেটির জন্য কেন বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে? এই বিলম্বের সরাসরি মাশুল দিতে হচ্ছে আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের লাখ লাখ বাসিন্দাকে।

বর্তমানে আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর ভুলতা ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিডের বড় ধরনের চাপ রয়েছে। অতিরিক্ত লোডের কারণে নিয়মিত লোডশেডিং, ভোল্টেজের ওঠানামা ও আকস্মিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

কোনো কারণে ভুলতা গ্রিডে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তখন আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে আড়াইহাজার গ্রিডটি চালু করা গেলে এখান থেকে প্রায় ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে ভুলতা গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং দুই উপজেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে।

আড়াইহাজার গ্রিড নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে রয়েছে এনার্জিপ্যাক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রিডটির কিছু বিশেষায়িত কারিগরি কাজ সম্পন্ন করার জন্য কোরিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসার কথা রয়েছে। ওই বিশেষজ্ঞ দল এসে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করলেই গ্রিডটি চালুর দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একটি বিশেষজ্ঞ দল আসা এবং তাদের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য যদি সর্বোচ্চ সাত থেকে ১০ দিনই প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে গ্রিডটি চালু করা হচ্ছে না কেন?

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, বিষয়টি আর কোনোভাবেই দীর্ঘসূত্রতায় রাখা উচিত নয়। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জরুরি উদ্যোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এক টেবিলে এনে কাজটি দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন।

আড়াইহাজার গ্রিড চালুর গুরুত্বের কথা স্বীকার করেছেন আরইবির আড়াইহাজারের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার টি এম মেজবা। তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশেই বর্তমানে কিছুটা বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় রূপগঞ্জেও কিছুটা সংকট রয়েছে। তবে আড়াইহাজারের নতুন গ্রিডটি চালু করা গেলে রূপগঞ্জের বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমে যাবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গ্রিডটি চালু হলে রূপগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিস্থিতি অনেক ভালো হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আসবে।

বিদ্যুৎ সংকটের তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রূপগঞ্জের রূপসী এলাকার ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। বিদ্যুতের সংকটের কারণে মানুষ অতিষ্ঠ। অনেক সময় পানিও তুলতে পারে না। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুতেই এর প্রভাব পড়ছে।’ তার মতে, একটি গ্রিড চালু করার জন্য যদি মাত্র কয়েক দিনের কাজ বাকি থাকে, তাহলে সেই কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত। কারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এখন আর অপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জ শুধু আবাসিক এলাকা নয়; এটি নারায়ণগঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে রয়েছে অসংখ্য পোশাক, নিটিং, স্পিনিং, ডাইং, ম্যানুফ্যাকচারিংসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানা। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও পড়ছেন বাড়তি খরচের চাপে। শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি উৎপাদন সচল রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই আড়াইহাজার গ্রিড চালু না হওয়ার প্রভাব শুধু ঘরবাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই—এর প্রভাব পড়ছে শিল্প, ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে।

আড়াইহাজার গ্রিডের বিষয়টি এখন আর কেবল একটি নির্মাণ প্রকল্পের প্রশাসনিক বিলম্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি লাখ লাখ মানুষের নাগরিক দুর্ভোগ, শিল্প উৎপাদন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একদিকে ভুলতা গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ, অন্যদিকে আড়াইহাজার গ্রিড চালু না হওয়া দুইয়ের সমন্বিত প্রভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে যখন সংশ্লিষ্টদের মতে, অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে কোরিয়ান বিশেষজ্ঞ দল এলেই বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব এবং সময় লাগতে পারে মাত্র সাত থেকে ১০ দিন, তখন এই বিলম্বের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

এ অবস্থায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজর দেওয়া জরুরি। প্রকল্পটির বর্তমান অগ্রগতি, অবশিষ্ট কাজ, কোরিয়ান বিশেষজ্ঞ দলের আগমনের সময়সূচি এবং গ্রিড চালুর সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যুৎ বিভাগের মধ্যে জরুরি সমন্বয় করে কাজটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার ব্যবস্থা করা দরকার।

আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের মানুষ এখন জানতে চান যে গ্রিড তাদের বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে, সেটি আর কতদিন অপেক্ষা করবে? একটি উন্নয়ন প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে তার ক্ষতি শুধু সরকারি নথিতে সময় বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রতিটি দিন মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।

তাই এখন সময় এসেছে দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটানোর। কোরিয়ান বিশেষজ্ঞ দল দ্রুত এনে প্রয়োজনীয় কারিগরি কাজ শেষ করে আড়াইহাজার ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিডটি চালু করা গেলে একসঙ্গে দুই উপজেলার বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের স্বস্তি আসতে পারে। সাত থেকে ১০ দিনের কাজ যদি সত্যিই বাকি থাকে, তাহলে সেটি সাত বছর ধরে ঝুলে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট উচ্চমহল দ্রুত বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলে শুধু বিদ্যুৎ সংকটই কমবে না আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলও পাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস। লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগ কমানোর পাশাপাশি সচল থাকবে শিল্পকারখানা, বাড়বে উৎপাদন এবং শক্তিশালী হবে স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি।

শিল্প কলকারখানায় কর্মরত শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, অতিরিক্ত লোডশেডিং এর কারন দোকানে ক্রেতা আসছে না। প্রত্যেকটা দোকানের চার-পাঁচজন স্টাফ থাকায় বেতন নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে দোকান মালিকদের। লোডশেডিং এর কারনে শ্রমিকরা প্রোডাকশন ঠিকমতো করতে পারছেন না। দীর্ঘ সময় ধরে গ্যস ও বিদ্যুতের অপেক্ষায় বসে থাকতে হচ্ছে। এরকম ভাবে চলতে থাকলে রূপগঞ্জের সকল শিল্পকারখানা অচল হয়ে পড়বে। দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওঠার জোর দাবি জানিয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে।

এ ওয়ান পোলার লিমিটেড এর জেনারেল ম্যানেজার কামরুল হাসান জানান, আমাদের এই ইউনিটে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তারা ঠিকমতো উৎপাদন করতে পারছে না। শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে কারণ তারা সাধারন কর্ম ঘণ্টাতে কাজ পাচ্ছে না।দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওটা না গেলে শিল্প কলকারখানা বন্ধের দিকে চলে যাবে। তাই বিদ্যুতের নতুন সাবস্টেশন চালু করে সমস্যা সমাধানের জন্য অনুরোধ জানান।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জয় জানান, রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে এখন আড়াইহাজারে নতুন একটি সাব স্টেশন হচ্ছে। ওই সাব স্টেশনে অন্য একটি লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে আর এটি চালু হবে সেপ্টেম্বর মাসে। যদি চালু হয় আড়াই হাজার যারে যে বিদ্যুৎটুকু যাচ্ছে হরিপুর লাইন থেকে সেটি আর যাবে না এটি রূপগঞ্জে এসে যোগ হবে। এত রূপগঞ্জের বিদ্যুৎ সংকট দূর হবে।

নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির-২ জেনারেল ম্যানেজার আবুল বাশার আজাদ জানান,সরকার ঘোষিত জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিতরণের বরাদ্দের মাত্রাটা ব্যাপক হয়ে গিয়েছে। রূপগঞ্জ এবং আড়াইহাজার নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২ এর আওতায় যে অংশটুকু আছে এখানে বরাদ্দ কম হওয়ায় অতিরিক্ত লোডশেডিং দেখা দিচ্ছে। আড়াই হাজারে নতুন একটি গ্রীড চালু হওয়ার সম্ভাবনা আছে যদি এটি চালু হয় তাহলে রূপগঞ্জের বিদ্যুৎ সংকট দূর হবে।