প্রতীকী ছবি
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এবারের সংসদ নির্বাচনে পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে দুইটিতে স্বল্প ব্যবধানে জয়, একটি আসনে পরাজয়ের পর দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখন জেলা ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের কার্যকারিতা, তৃণমূলের সক্রিয়তা এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের ভূমিকা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান জয় পেলেও ব্যবধান ছিল মাত্র ২০ হাজার ভোট। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪০০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া পেয়েছেন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১৮ ভোট। ভোটের এই ব্যবধানকে সন্তোষজনক মনে করছেন না স্থানীয় নেতারা।
তাদের দাবি এ আসনে বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন ও রেজাউল করিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দলের ভোটে বিভাজন তৈরি হয়। ফলে প্রত্যাশিত ব্যবধান তৈরি হয়নি। নির্বাচন-পরবর্তী আলোচনায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের অনেকে বলছেন, অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের অভাবই ছিল প্রধান দুর্বলতা।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপির প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিএনপির জোট সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী পেয়েছেন ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এ আসনে কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেননি। তার ভরাডুবির পেছনে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী না দেয়াকেই কারণ হিসেবে দেখছেন ভোটাররা।
ফতুল্লা এলাকার বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, শাহ আলম, গিয়াসউদ্দিনসহ একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীর অংশগ্রহণে ভোটের বড় অংশ ভাগ হয়ে যায়। পাশাপাশি রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আলীও কিছু ভোট কেটে নেয়। দলীয় ঐক্যের অভাবই এখানে ভরাডুবির অন্যতম কারণ বলে তারা মনে করছেন। তাছাড়া দলটির নেতাকর্মীরা এখানে কাশেমীকে বিএনপির নেতাকর্মীরা গ্রহণ করতে পারেননি বলে মনে করছেন অনেকে।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবুল কালাম ১৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পান। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৯৯ ভোট, আর খেলাফত মজলিসের এবিএম সিরাজুল মামুন পেয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ১৯৬ ভোট। যদিও এখানে প্রকাশ্য বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল না, তবুও মনোনয়ন বঞ্চিতদের একাংশ মাঠে সক্রিয় ছিলেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ থাকায় অনেকেই নির্বাচনী প্রচারে পুরোপুরি যুক্ত হননি। এর প্রভাব ভোটের ফলাফলে পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ শহরকেন্দ্রিক এলাকা হওয়ার এ আসনে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের কমিটি না থাকা এবং তরুণদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের অভাবে বিএনপি এখানে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা এবং তরুণদের ইস্যুভিত্তিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রেও ঘাটতির কথা স্বীকার করছেন দলের নেতারা।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা ও মহানগর কমিটির কার্যক্রম মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস, অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন এবং তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ত করতে নতুন কৌশল নেওয়ার আলোচনা চলছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা এবং পর্যালোচনা বৈঠকও হতে পারে শিগগিরই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে বিবেচিত। এখানে সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে দলটি। সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনের ফলাফল নারায়ণগঞ্জে বিএনপির জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বল্প ব্যবধানের জয় কিংবা অপ্রত্যাশিত পরাজয় দুটিই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভেতরের ঘাটতি দূর না করলে সামনে পথ আরও কঠিন হতে পারে।

