ফাইল ছবি
একসময় যে নদীর স্বচ্ছ পানিকে তুলনা করা হতো ডাবের জলের সঙ্গে, আজ সেই শীতলক্ষ্যার বুক চিরে বইছে আলকাতরার মতো কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত স্রোত। যে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বিশ্বখ্যাত জামদানি, গৌরবময় এক ঐতিহ্য, সেই নদীই এখন শিল্পবর্জ্য আর দখলদারির ভারে মৃতপ্রায়। শীতলক্ষ্যার এই মরণদশা কেবল পরিবেশ নয়, সরাসরি আঘাত হানছে জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূলে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের চর সৈয়দপুর থেকে নরসিংদীর পলাশ পর্যন্ত নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা শত শত কারখানার নালা দিয়ে সরাসরি অপরিশোধিত বর্জ্য পড়ছে নদীতে।
কুচকুচে কালো রং আর উৎকট দুর্গন্ধের কারণে নদীপথে চলাচল করাই এখন দায় হয়ে পড়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, প্রতিদিন অন্তত ১৫ কোটি লিটার অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য বিভিন্ন নালা ও খাল দিয়ে শীতলক্ষ্যায় মিশছে। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পয়োবর্জ্যের বেশির ভাগই কোনো শোধন ছাড়াই এই নদীতে গিয়ে পড়ছে।
বিপন্ন ঐতিহ্য ও শিল্প : শীতলক্ষ্যার পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় বড় সংকটে পড়েছে দেশের প্রথম জিআই পণ্য জামদানি শিল্প।
৭০ বছর বয়সী প্রবীণ জামদানি কারিগর সুরত আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, আগে ভোরবেলায় নদীর পানি দিয়ে সুতা প্রক্রিয়াজাত করা হতো, যা জামদানির উজ্জ্বলতা ও স্থায়িত্ব বাড়াত। এখন নদীর পানি ব্যবহারের অযোগ্য হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানি ও ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে আদি জামদানির আসল বৈশিষ্ট্য।
জামদানি গবেষক পাভেল পার্থর মতে, শীতলক্ষ্যার পানির বিশেষ গুণাগুণই জামদানিকে অনন্য করেছিল।
নদীদূষণে আজ সেই ভৌগোলিক ঐতিহ্যের অস্তিত্ব বিপন্ন।
মরণাপন্ন জীববৈচিত্র্য : জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে শীতলক্ষ্যা নদীর গতিপথে ৪৯০টি দূষণের স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। পানিতে যেখানে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) থাকা প্রয়োজন অন্তত ৪৬ মিলিগ্রাম, সেখানে শীতলক্ষ্যায় তা নেমে এসেছে মাত্র ০.৫ মিলিগ্রামে। অ্যামোনিয়ার মাত্রা সহনীয় সীমার চেয়ে পাঁচ গুণ বেড়ে যাওয়ায় নদীটি মাছ ও জলজ প্রাণীর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর ৩৫ প্রজাতির মাছের মধ্যে ২০টি প্রজাতি এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। বাকি প্রজাতির মাছও বর্ষাকাল ছাড়া খুব একটা দেখা মেলে না।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ৩১৮টি তরল বর্জ্য নির্গমনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সবকটিতেই ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ বাঁচাতে বেশির ভাগ কারখানাই রাতের আঁধারে ইটিপি বন্ধ রেখে সরাসরি বর্জ্য নদীতে ছাড়ে।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ এইচ এম রাশেদ বলেন, ‘ইটিপি থাকার পরেও অনেক প্রতিষ্ঠান দূষিত রাসায়নিক মিশ্রিত পানি নদীতে ছাড়ছে। এ কারণেই নদীগুলো দূষিত হচ্ছে। আমরা বারবার জরিমানা করছি, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। স্থায়ী সমাধানের জন্য সেন্ট্রাল ইটিপি বাস্তবায়ন করতে হবে।’
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, শীতলক্ষ্যার এই বিষাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে চর্মরোগ, এমনকি দীর্ঘ মেয়াদে ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি বাড়ছে।
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন বলেন, এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা পরিকল্পনা না নিলে শীতলক্ষ্যাকে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

