বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

|

ফাল্গুন ১২ ১৪৩২

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব তরুণ-যুবকরা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ১২:২১, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব তরুণ-যুবকরা

প্রতীকী ছবি

ছিল সুখী পরিবার। ছিল জায়গাজমি। ছোটখাটো ব্যবসাও ছিল। কায়েতপাড়া ইউনিয়নের অর্জুন সরকার (ছদ্মনাম) আজ পঙ্গুপ্রায়।

এখন সংসার নেই। নেই জমিজমা। কোনোমতে তিন বেলা ভাত জোটে। তা-ও হাড়ভাঙা খাঁটুনির পর।

একে একে তিনটি বিয়ে করেছেন অর্জুন। কিন্তু কোনো বিয়ে বেশিদিন টেকেনি। প্রায় কোটি টাকা মূল্যের জমি ছিল। এগুলো সবই শেষ হয়েছে ইন্টারনেটে ‘বিমানে বাজি’র কারণে।

আজ তিনি নিঃস্ব। বিমানে নিঃস্ব হয়ে তিনি আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিলেন। আশপাশের লোকজন দেখে ফেলায় জীবন ফিরে পান। তবু তাঁর ‘বিমানে ওড়াউড়ি’ যেন থেমে নেই।
একই অবস্থা দাঁড়িয়েছে রূপগঞ্জ ইউনিয়নের রোমান মিয়ার (ছদ্মনাম)।

স্ত্রী-মেয়েসহ তিনজনের সংসার তাঁর। বাবার ব্যবসার সঙ্গে সময় দেন হাটে-ঘাটে। একমাত্র সন্তান হওয়ায় ষাটোর্ধ্ব বাবা তাঁকেসহ তাঁর পরিবারের ভরণ-পোষণ দেখভাল করেন। এক বন্ধুর পাল্লায় পড়ে ওঠে পড়েন অনলাইন গেম বিমানে! মাত্র কয়েক মাসে ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন। বাবার ব্যবসায়ও মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। সারা দিন মুঠোফোনে ওড়াউড়ি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বাড়িতে সব জেনে ঋণ পরিশোধ করে পরিবার। কয়েক দিন ভালোই কাটে। এরপর আবার খপ্পরে পড়ে শুরু করেন বিমান খেলা। গত ২০ দিন আগে ঘরের আলমারি ভেঙে বাবার ব্যবসার আড়াই লাখ টাকা নিয়ে লাপাত্তা তিনি। এখনো খোঁজ মেলেনি। এ তো শুধু অর্জুন সরকার আর রোমান মিয়ার পরিবারের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার গল্প।

রোমান আর অর্জুনের মতো নারায়ণগঞ্জ জেলার প্রায় দেড় লাখ তরুণ-তরুণী-যুবক, শিক্ষার্থী, শ্রমিক এখন মুঠোফোনে অনলাইন গেম বিমানে ওড়াউড়ি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায়। এ জেলায় প্রতিদিন অনলাইন জুয়া খেলায় প্রায় আট কোটি টাকা লেনদেন হয়। মাসে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। সাড়ে ৭০০ এজেন্ট অবৈধ অনলাইন জুয়ার লেনদেনের সঙ্গে জড়িত বলে জানায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সংস্থা।

বিমান খেলাকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে দুই যুবক নিহত হওয়ার খবর রয়েছে। জুয়াড়িদের দ্বন্দ্বে প্রতিনিয়ত সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে। আত্মহত্যা করেছে পাঁচ তরুণ। তবে হাজার হাজার তরুণ-যুবক নিঃস্ব হলেও এজেন্টরা ফুলে-ফেঁপে অঢেল টাকা ও সম্পদের মালিক হয়েছেন—এমনটা জানা গেছে। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে মিলেছে এমন সব তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভিডিও গেমসের মতো রঙিন গ্রাফিক, প্রলুব্ধকর বিজ্ঞাপন আর মুহূর্তেই কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন। ইন্টারনেটে ‘অ্যাভিয়েটর’ বা ‘বিমানে বাজি’ ধরার মতো গেমগুলো এখন উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী, পরিবহন-গার্মেন্টস শ্রমিক ও বেকার যুবকদের কাছে এক মারণনেশায় পরিণত হয়েছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে একটি বিমান উড়ছে, আর সেই উড্ডয়নের সঙ্গেই বাড়ছে বাজির টাকা। কিন্তু বিমানটি অদৃশ্য হওয়ার আগেই যদি ক্যাশ-আউট না করা হয়, তবে সব শেষ।

জেলা গোয়েন্দা সংস্থা ও কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, সোনারগাঁও, বন্দর, সদর উপজেলা, সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানার প্রতিটি পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে এখন এক অদৃশ্য নেশার বিস্তার। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় জেঁকে বসেছে অনলাইন জুয়া। এজেন্টরা বেকার যুবক, শিক্ষার্থী ও কারখানার শ্রমিকদের টার্গেট করছেন। তারা বিমান, ওয়ানএক্সবেট, মেলবেট এবং বিভিন্ন ক্যাসিনো অ্যাপে আসক্ত হয়ে পড়ছে।

কালের কণ্ঠের এই প্রতিবেদক বেশ কয়েক দিন অনুসন্ধান চালান জেলায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণঞ্জ জেলাজুড়ে সাড়ে ৭০০ এজেন্ট জাল পেতে ঘাপটি মেরে বসে আছেন। তাঁরা জেলার অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন। বিমান ওড়াতে ইচ্ছুক এমন ইচ্ছা পোষণ করে কথা হয় বিমানের এক এজেন্টের সঙ্গে। তবে সেটি সম্ভব হয়েছে কয়েক দফা চেষ্টার পর। ওই এজেন্টের হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলে জানা যায় ভয়ংকর সব তথ্য। নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে তিনি বলেন, ‘জেলায় এক হাজারের ওপরে এজেন্ট নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছে। কমপক্ষে দেড় লাখ লোক এখন বিমান ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকা লেনদেন হয়। এজেন্টরা কমিশন পায়। কয়েক হাজার মানুষ পথের ভিখারি হয়ে গেছে।’

জেলার বিভিন্ন থানা থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনলাইন জুয়ার কারণে পারিবারিক কলহ বেড়ে গেছে। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত জেলায় ৪৭টির মতো ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। আর চুরি-ডাকাতি মিলিয়ে প্রায় এক হাজার ১০০ ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালে জেলায় পারিবারিক কহলের ঘটনা ঘটেছে ৬৭টি। আর পারিবারিক কলহের কারণে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩৯টি। ২০২৫ সালে পারিবারিক কলহের ঘটনা ঘটেছে ৮৬টি। আর পারিবারিক কলহের কারণে আত্মহত্যা ঘটেছে ১৭টি। এজাহার ও ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, প্রতিটি ঘটনার পেছনে অনলাইন জুয়া রয়েছে। থানার পুলিশ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

রূপগঞ্জ থানার ওসি সবজেল হোসেন বলেন, ‘এজেন্টদের ধরা খুব কঠিন। আমরা কোনো খবর পেলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’

নারায়ণগঞ্জ জজকোর্টের আইনজীবী আবুল বাশার রুবেল বলেন, ‘এসংক্রান্ত মামলা খুব কমই আসে। বিশেষ করে অনলাইন জুয়াড়ি। মাঝে মাঝে সাধারণ জুয়াড়ি আসে, তারা সহজেই জামিন পেয়ে যায়।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার বলেন, ‘জুয়া নিয়ে আমরা কাজ করছি। বিশেষ করে অনলাইন জুয়া নিয়ে। আমরা এরই মধ্যে বেশ কিছু জুয়ার বোর্ড ধরেছি।’