মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

|

আশ্বিন ৫ ১৪৩৩

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

শামীম ওসমান বলেছিলেন, ‘মার মার’

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ২৩:২৪, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শামীম ওসমান বলেছিলেন, ‘মার মার’

ফাইল ছবি

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি ও বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মাহমুদ হোসেন।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি জবানবন্দি দেন।

প্রসিকিউশনের দাবি, জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থান দমনে অস্ত্র হাতে নিয়ে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি শামীম ওসমান। ছাত্র-জনতাকে হত্যার জন্য পুরো পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন শামীম ওসমান। তিনি নিজেও অস্ত্র হাতে নিয়ে গুলি করেছেন।

এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগের প্রথম অভিযোগ হলো, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চাষাঢ়া, ফতুল্লা থানাধীন সাইনবোর্ডসহ আশপাশের এলাকায় কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিক্ষার্থী পারভেজ, পোশাককর্মী রাসেল ও ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে।

দ্বিতীয় অভিযোগ, ২১ জুলাই ফতুল্লা থানাধীন ভূইগড় বাসস্ট্যান্ডের সামনে আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিবকে হত্যা করা হয়।

তৃতীয় অভিযোগ, ৫ আগস্ট বদিউজ্জামান ও আবুল হাসানকে হত্যা করা হয়।

প্রসিকিউশনের দাবি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের অনুমতি নিয়ে নিজের সশস্ত্র বাহিনী তথা এ মামলার ১১ আসামিকে সঙ্গে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে হত্যাকাণ্ডে মেতে ওঠেন শামীম ওসমান।

এ মামলায় শামীম ওসমান ছাড়াও তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। তবে আসামিদের সবাই পলাতক।

জবানবন্দিতে মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, জালকুড়ি লিংক রোড এবং নারায়ণগঞ্জ সদরে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলতে থাকি। এই আন্দোলনে আমরা বাধার সম্মুখীন হই এবং আমাদের অনেকেই আহত ও নিহত হন। আমাদের দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক আবু হাসান টিপু গুলিবিদ্ধ হন। আমি নিজে টিয়ারশেলের আঘাতে আহত হই। ওই আঘাতে আমার ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই আঘাতের ঘটনাটি ঘটে চাষাঢ়া রাইফেল ক্লাবের সামনে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট।’

২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের ঘটনা উল্লেখ করে মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘শামীম ওসমানের নেতৃত্বে চাষাঢ়া, জালকুড়ি এলাকায় অনেক গোলাগুলি হয় এবং অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। যারা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন, তাদের মধ্যে আদিল ও ইয়াছিনও আছেন। ওই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ডিআইটি রোডে রিয়া গোপ নামে একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। ওই দিনের ঘটনায় আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম এবং ঘটনার বিষয়টি মোবাইল ফোনে ধারণ করি। যা আমি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দেখিয়েছি।’

যারা গুলি করেন তাদের মধ্যে ১. শামীম ওসমান, ২. শাহ নিজাম, ৩. অয়ন ওসমান, ৪. তানভীর মোহাম্মদ টিটু, ৫. ভিকি, ৬. আজমেরী ওসমান, ৭. সাংবাদিক রাজু আহমেদ, ৮. ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ, ৯. ছাত্রলীগ নেতা সোহানুর রহমান শুভ, ১০. শ্রমিক লীগ নেতা কাওছার আহমেদ পলাশ, ১১. শ্রমিক লীগ নেতা সবুজ শিকদার, ১২. শ্রমিক লীগের সদস্য সবুজ।

৫ আগস্টের ঘটনার কথা উল্লেখ করে মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘আমরা একটি প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করি। ওই দিন আমরা আমাদের পার্টি অফিস থেকে মিছিলসহকারে কালীবাজার হয়ে কুমুদিনীর দিকে যাচ্ছিলাম। তখন একজন বিটিভির সাংবাদিক হেলাল আমাদের বলেন, তোমরা ওই দিকে যেয়ো না। ওই দিকে শামীম ওসমান দলবলসহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছেন।’

‘তখন আমরা কুমুদিনীর সামনে অবস্থান করি। তখন শামীম ওসমানের দলবল শামীম ওসমানের বাড়ির দিকে ঢোকে। এরপর আমরা মিশনপাড়ার মোড়ে জমায়েত হই। সেখানে আমরা প্রতিবাদ মিছিল করে চাষাঢ়ার দিকে যাই। আমরা মিছিল করে সামনের দিকে অগ্রসর হলে পেছন থেকে শামীম ওসমানের লোকজন আমাদের একজন কর্মী বদিউজ্জামানকে ধরে নিয়ে যায় এবং বদিউজ্জামানকে শহীদ মিনার মোড়ে লোহার রড, পাইপ ও গজারি গাছের ডাল ইত্যাদি দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। তখন আমরা বদিউজ্জামানকে উদ্ধার করতে আসি। শহীদ মিনারে এসে দেখি শামীম ওসমান বলছেন, “মার মার”। তার কথায় বদিউজ্জামানকে পেটাচ্ছিলেন সবুজ শিকদার, রিয়াদ, শুভ, শফিক, অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, রুস্তম, তানভীর মোহাম্মদ টিটু ও চুন্নু মাস্টারসহ আরও অনেকেই।’

মাহমুদ হোসেন আরও বলেন, ‘কবির নামের একজন তার মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। আমি যাওয়ার পরে এই আসামিরা আমাকেও এলোপাতাড়ি মারধর করে। আমার মাথা ফেটে যায়। আমার মাথায় সেলাই আছে। একপর্যায়ে আমাদের সংখ্যা বেড়ে যায়। তখন শামীম ওসমানের লোকজন পিছু হটে শামীম ওসমানের বাড়ির দিকে চলে যায়। পরে বিভিন্ন বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে বদিউজ্জামানকে হাসপাতালের ভেতরে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করে বলেন, সে মৃত।’