বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

|

আশ্বিন ৭ ১৪৩৩

Advertisement
Narayanganj Post :: নারায়ণগঞ্জ পোস্ট

লিবিয়ায় প্রবাসী অপহরণ, গ্রেপ্তার ২

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশিত: ১৯:৪৮, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লিবিয়ায় প্রবাসী অপহরণ, গ্রেপ্তার ২

ফাইল ছবি

লিবিয়ায় বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিককে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে আটকে রেখে পরিবারের কাছে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জ। গ্রেপ্তার দুজনের মধ্যে একজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে পুলিশ। 

গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন—সোনারগাঁয়ের বিজয়নগর এলাকার উত্তম সরকার ওরফে সুমন (৪৪) এবং মর্জিনা বেগম (৩৯)। পিবিআই জানিয়েছে, বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে আদালতের অনুমতিতে তিন দিনের পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ইদ্রিস আলী (৫৪) নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের বিজয়নগর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ায় প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে অবস্থান করছিলেন।

মামলার এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যের বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির আনজারা এলাকায় বাসার সামনে তিনটি গাড়িতে করে অস্ত্রধারী কয়েকজন ব্যক্তি ইদ্রিস আলীর বাসা ঘিরে ফেলে। এ সময় উত্তম সরকার ওরফে সুমন, আসলাম, আরিফ মোল্লা ও রাজু মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অপহরণ করে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ইদ্রিস আলীর চোখ বেঁধে তাকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। তার পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর অজ্ঞাত একটি স্থানে নিয়ে তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়।

পিবিআই জানায়, আটকের দুই দিন পর ইদ্রিস আলীকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে মারধর করা হয়। সেই নির্যাতনের ভিডিও মোবাইল ফোনে ইমোর মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে দেখানো হয়। একই সঙ্গে স্বামীকে হত্যা করার হুমকি দিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

প্রথমে ইদ্রিস আলীকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ২০ লাখ টাকা দাবি করে চক্রটি। স্বামীর জীবন বাঁচাতে ফাতেমা বেগম আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে ১৯ মার্চ শিপন মিয়া নামের একটি ইসলামী ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা পাঠান বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

পিবিআই জানায়, টাকা পাওয়ার পর দুই দিন ইদ্রিস আলীর ওপর নির্যাতন বন্ধ রাখে অপহরণকারীরা। পরে আবারও তাকে মারধর করে আরও ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। লোহার রড দিয়ে মারধরের কারণে ইদ্রিস আলীর ডান পা ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন তৈরি হয়। অপহরণকারীরা তাকে দীর্ঘ সময় ধরে অমানবিকভাবে আটকে রাখে এবং দিনে মাত্র একটি রুটি ও এক বোতল পানি দেওয়া হতো বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।

পরবর্তীতে স্বামীর জীবন রক্ষার জন্য ফাতেমা বেগম তার মেয়ে মাহফুজা বেগমের জনতা ব্যাংকের হিসাবের মাধ্যমে ৬ এপ্রিল ২৮ লাখ টাকা আরটিজিএস করেন মোছাঃ মঞ্জু নামের একটি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের হিসাবে। ওই টাকা থেকে মঞ্জু চার লাখ টাকা রেখে বাকি ২৪ লাখ টাকা পরদিন মর্জিনা বেগমের ইসলামী ব্যাংকের হিসাবে পাঠান বলে পিবিআই জানিয়েছে। একই সময়ে বিকাশের মাধ্যমে আরও আড়াই লাখ টাকা পাঠানো হয়।

সব মিলিয়ে ইদ্রিস আলীর পরিবার ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে অপহরণকারীদের মোট ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠায় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

পিবিআই জানায়, প্রায় এক মাস ১৪ দিন আটকে রাখার পর ৮ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইদ্রিস আলীর চোখ বেঁধে গাড়িতে করে ত্রিপোলির মদিনা এলাকায় নিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায় অপহরণকারীরা। পরে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় ২২ জুলাই ২০২৫ দেশে ফেরেন তিনি।

এ ঘটনায় ইদ্রিস আলী বাদী হয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর সোনারগাঁও থানায় মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩৪২, ৩২৩, ৩২৫, ৩৬৫, ৩৮৫, ৩৮৬, ৩০৭, ১০৯ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

পিবিআই হেডকোয়ার্টার্সের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মামলাটি ১৬ সেপ্টেম্বর পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা স্ব-উদ্যোগে তদন্তের জন্য গ্রহণ করে। এসআই (নিঃ) মফিজুল ইসলামকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

পিবিআইয়ের তদন্ত দল তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানাধীন সাইনবোর্ড এলাকা থেকে মামলার এজাহারভুক্ত ১ নম্বর আসামি উত্তম সরকার ওরফে সুমন এবং ৭ নম্বর আসামি মর্জিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তারের পর তাদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তিন দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে বুধবার তাদের আদালতে পাঠানো হয়। এ সময় মর্জিনা বেগম ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।

পিবিআইয় জানায়, লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রটি বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের টার্গেট করত। অস্ত্রের মুখে অপহরণের পর নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের সদস্যদের দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করত চক্রটি।

পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোঃ মোস্তফা কামাল রাশেদ বিপিএম জানান, মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তার দুই আসামির দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।